-সালাহুদ্দিন সাঈদ



বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় প্রধান প্রশ্ন

শান্তি চায় না, পৃথিবীতে কে আছে এমন?। সবাই শান্তি চায়। শান্তির জন্যই মানব জীবনের হাজারো পদক্ষেপ-হস্তক্ষেপ। কিন্তু কাঙ্খিত সেই শান্তি কেন ধরা দেয় না? নিরপেক্ষ-পর্যালোচনায় গভীরভাবে একটু ভাবা প্রয়োজন।
 

প্রথমেই ভাবতে অশান্তির কারণ নিয়ে। অশান্তির আসল কারণ হলো মন্দ কাজ। মুক্তমনা কিংবা ‘যুক্তমানা’-সবাই তো মন্দ পরিহার করে চলে। পরিহার করতে বলে। কিন্তু যে প্রশ্নে মতানৈক্য, তা হলো ‘কোনটি ভালো, কোনটি মন্দ?’। কারণ ভালো এবং মন্দের ধারণা হলো একটি আপেক্ষিক বিষয়। একজনের কাছে যেটা ভালো আরেকজনের কাছে সেটা মন্দ, তেমনিভাবে প্রথম জনের কাছে যেটা মন্দ দ্বিতীয় জনের কাছে সেটাই ভালো। এ যেন এক মীমাংসাহীন প্রশ্ন। 


এ জন্য প্রয়োজন ‘কোনটি ভালো, কোনটি মন্দ’ সেটা নির্ধারণের চূড়ান্ত একজন বিচারক থাকা এবং সবাইকে তাঁর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়া। কিন্তু কে হবেন তিনি? যার নির্ধারণ করা ‘ভালো’টাকে আমারা চূড়ান্তভাবে ‘ভালো’ এবং ‘মন্দ’টাকে চূড়ান্তভাবে ‘মন্দ’ বলে মেনে নেব? এই শেষ সিদ্ধান্ত নেবার ও দেবার কর্তৃত্ব ও অধিকার হচ্ছে সার্বভৌমত্ব। এ সার্বভৌমত্ব হতে পারে স্রষ্টার কিংবা সৃষ্টির (মানুষের)। বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় সবচে’ গুরুত্বপূর্ণ এটাই যে, ‘বিশ্বে সার্বভৌমত্ব হবে কার?’।

বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় সার্বভৌমত্ব : স্রষ্টা এবং সৃষ্টির

মনবপ্রজন্মের উষালগ্ন থেকেই পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য যুগে যুগে কত সাধক পদক্ষেপ নিয়েছেন, কত-শত কর্মসূচি দিয়েছেন, কিন্তু শান্তি নামের কল্পিত সেই সোনার হরিণ সাড়া দেয়নি কারো ডাকেই। না লেনিনবাদের, না পুঁজিবাদের। না গণতন্ত্রের, না রাজতন্ত্রের। কিন্তু বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় মুহাম্মাদ সা. এর  ইসলাম ছিল একটি সফল ও কার্যকরি পদক্ষেপ। 

মদিনা সনদ ও শান্তি প্রতিষ্ঠা
মদিনায় হিজরতের পর তিনি সেখানে শান্তিপূর্ণ ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠা করেন। মদিনায় বসবাসরত পৌত্তলিক, মুসলমান, ইহুদি ও খ্রিষ্টান প্রভৃতি সম্প্রদায়ের মধ্যে বিরাজমান হিংসা-বিবাদ ও বিদ্বেষপূর্ণ অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে সকল গোত্রপ্রধানদের আহ্বান করে তাদেরকে বিশ্বমানবতার ঐক্য ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির আবশ্যকতা বুঝিয়ে একটি সনদ প্রস্তুত করেন। মদিনায় বসবাসকারী সম্প্রদায়গুলোর সকল প্রধানেরাই এ শান্তিচুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। এভাবে তিনি মদিনায় সন্ত্রাসবাদ নির্মূল করে শান্তি স্থাপন করেন।

হুদায়বিয়ার সন্ধি ও শান্তি প্রতিষ্ঠা
বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় মহানবী সা. এর অনবদ্য ভূমিকার অনন্য স্মারক হুদায়বিয়ার সন্ধি। রাসুল সা. সাহাবিদের প্রবল অনিচ্ছা সত্ত্বেও কোরাইশদের এক বাহ্যিক-পরাজয়মূলক অসম চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিলেন কেবল শান্তি প্রতিষ্ঠার স্বার্থে।

চুক্তির ছয়টি ধারার প্রতিটি ছিল চরম মানবতা-বিরোধী ও বৈষম্যমূলক। চরম অপমানজনক ও বিদ্বেষপূর্ণ। চুক্তির ধারাগুলো পর্যালোচনা করলে সামান্য বোধের মানুষের মনেও প্রশ্নের উদয় হতে পারে, ‘হযরত মুহাম্মদ সা. কেন এ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিলেন?’ হ্যা, তিনি তা করেছিলেন শুধুই শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য। অল্প সময়ের মধ্যে প্রমাণিতও হয়েছিল সেটি।

মক্কা বিজয়: বিশ্বশান্তির বার্তা
মক্কাভূমি শান্তিপূর্ণভাবে চূড়ান্ত বিজয়ের পর রাসুলুল্লাহ সা. পবিত্র কা’বা ঘরের চৌকাঠে হাত রেখে দাঁড়িয়েছিলেন। তখন তার সামনে অতীতের সব জঘন্য অপরাধ নিয়ে অবনত মস্তকে দাঁড়িয়ে ছিল মক্কার অধিবাসীরা। তাদের ঘিরে নির্দেশের অপেক্ষায় তীর-তলোয়ার হাতে দাঁড়িয়ে ছিলেন মুসলিম-সেনাদল। মক্কার অপরাধীদের সে সঙ্গীন মুহূর্তে মহানবী সা. চাইলে বলতে পারতেন, ‘যে হাত শান্তিকামী তাওহিদবাদীদের ওপর নিষ্ঠুর নির্যাতন চালিয়েছিল, ওই হাতগুলো ভেঙ্গে দাও! যে চোখগুলো অসহায় মুসলমানদের দিকে হায়েনার হিংস্রতা নিয়ে তাকিয়ে ছিলো, সে চোখগুলো উপড়ে ফেলো! যে জিবগুলো আল্লাহ ও তার রাসুল এবং মুমিনদের বিরুদ্ধে শুধুই মিথ্যা অপবাদ ও কুৎসা রটনা করে বেড়াত, সে জিবগুলো কেটে দাও!’ তিনি চাইলে ঘোষণা করতে পারতেন, ‘আজ থেকে কোরাইশদের জালিম পুরুষেরা বিজয়ী মুসলিম বাহিনীর গোলাম এবং নারীরা দাসী হিসেবে গণ্য হবে।’

কোরাইশরাও তাদের প্রাপ্য এমনটাই ভেবে রেখেছিল। কিন্তু মহানবী সা. অপার বদান্যতা ও অনুপম মহানুভবতা দেখিয়েছিলেন সেদিন। তিনি বলেছিলেন-

لاَ تَثْرِيبَ عَلَيْكُمُ اليَوْمَ
‘আজ তোমাদের কারো বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই।’
(সূরা ইউসুফ)


শান্তি প্রতিষ্ঠার কাজে মক্কার জীবন ও মদিনার জীবন-সর্বত্রই শত অত্যাচার-নির্যাতন ও ষড়যন্ত্র করে আজীবন যে জাতি তাঁকে সীমাহীন কষ্ট দিয়েছে, মক্কা বিজয়ের দিন তাদেরকে অতুলনীয় ক্ষমা প্রদর্শন করে  তিনি একটি শান্তিপূর্ণ বিশ্ব-সমাজব্যবস্থারই বুনিয়াদ রচনা করেছিলেন।

কিন্তু তা তিনি কীভাবে পেরেছিলেন? কেন পেরেছিলেন? কারণ তিনি সা. বিশ্বের অন্যান্য সংস্কারকদের মতো সাধারণ কোন সংস্কারক ছিলেন না। তিনি ছিলেন বিশ্ববাসীর প্রতি আল্লাহর প্রেরিত শান্তি, মুক্তি, প্রগতি ও সামগ্রিক কল্যাণের দূত। মনব-জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে কিভাবে দেশ ও সমাজে এবং মানুষের মনের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা যায়, সে সব চিন্তা ও কর্ম পদ্ধতি তিনি প্রদান করে গেছেন অহীর আলোকে। 


হয়তো আরবের নেতাদের সেচ্ছাচারিতা ও কুলিনদের দাম্ভিকতা কতটা মারাত্মক ও ভয়ঙ্কর এবং তাতে মনাব-সমাজ অশান্তি-গহ্বরের কতটা গহীনে তলিয়ে যেতে পারে, তা তিনি কৈশোরেই আঁচ করেছিলেন এবং ব্যক্তিগতভাবেই তিনি পৃথিবীতে শান্তির পরিবেশ গড়ে তুলার পণ করেছিলেন। কিন্তু অশান্তিভরা পৃথিবীতে শান্তির স্নিগ্ধ-সমীরণ বইয়ে দেওয়ার জন্যে মহান স্রষ্টা আল্লাহ তা’আলাই তাঁকে প্রেরণ করেছিলেন। বলেছিলেন-

 وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِلْعَالَمِينَ
‘আমি আপনাকে সমগ্র বিশ্বজগতের জন্য রহমতস্বরূপ প্রেরণ করেছি।’
(সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত- ১০৭)


তাই জন্ম থেকে মুত্যু পর্যন্ত তিনি ছুটেছেন শান্তির ফেরি করে। বোধহীন শৈশবে, দুরন্ত কৈশোরে, উদ্দীপ্ত তারুণ্যে এবং জীবনসায়াহ্নে। শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় করেছেন নিরন্তর সংগ্রাম ও সাধনা। শান্তির নিমিত্তেই যার জন্ম, আজীবন  সে ঠিকানায়ই তিনি ছুটে চলবেন, এটাই স্বাভাবিক।

রাসূলের সা. শান্তি প্রতিষ্ঠা: মনীষীদের মূল্যয়ন
মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা ও মানবতার সুন্দরতম আদর্শ প্রতিষ্ঠায় মহানবী সা. যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন, তা দেখে যুগে যুগে বিশ্ববরেণ্য মহামনীষীগণ অনেক সুন্দর সুন্দর অভিব্যক্তি প্রকাশ করেছেন।

ইংরেজ কবি জন কীটস্ বলেন, ‘পৃথিবীর যা কিছু মঙ্গলময়, যা কিছু মহৎ ও সুন্দর সবই নবী মুহাম্মদ সা. এর কল্যাণে। তাঁর তুলনা তিনি নিজেই।’’ ‘লা-মার্টিন’ ফ্রান্সের একজন খ্যাতনামা ঐতিহাসিক ব্যক্তি মুহাম্মদ সা. সম্পর্কে মন্তব্য করেন- “মানুষের মহত্ব পরিমাপ করার যতগুলো মাপকাঠি আছে, এর সবগুলো দিয়ে পরিমাপ করলে রাসূল সা. এর সমতুল্য দ্বিতীয় আর একজনও পাওয়া যাবে না।” (তত্ত্বসূত্র- উইকিপিডিয়া/ইন্টারনেট)

এসব বিশ্ববরেণ্য মনীষীগণ মহানবী সা. এর আদর্শ এবং জীবনের নানাবিধ কর্মকান্ডের ব্যাপক বিচার-বিশ্লেষণ করে বিস্ময়ে হতবাক হয়েছেন। তাঁর বলিষ্ঠ নেতৃত্ব, সুন্দরতম চরিত্র, অনুপম আদর্শ, নির্ভীকতা ও সহনশীলতা, সততা, কতর্ব্যপরায়ণতা, ন্যায়নীতি, ক্ষমা, দয়া এবং নিষ্ঠার ইতিহাস জেনে তাঁরা অভিভূত হয়েছেন।। এটাও অকপটে স্বীকার করেছেন যে, মহানবী হযরত মুহাম্মদ সা. এর আদর্শই মানবতার মুক্তির একমাত্র পথ- যা বিশ্বশান্তিকে নিশ্চিত করতে পারে।


উপসংহার
সমস্যাসংকুল বিশ্বে, যেখানে মানুষ মৌলিক-মানবিক অধিকারবঞ্চিত, আন্তধর্মীয় সম্প্রীতি বিনষ্ট, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় মতপার্থক্য অসহ্য, সেখানে রাসুলুল্লাহ সা.-এর অনুপম জীবনাদর্শ এবং সর্বজনীন শিক্ষার অনুসরণই প্রতিষ্ঠা করতে পারে বহুপ্রত্যাশিত শান্তি ও সম্প্রীতি। বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় মুহাম্মদ সা. এর আদর্শই হতে পারে একমাত্র আদর্শ।


kastipathars@gmail.com