45647525

হিফ্জুল হাদীস : গুরুত্ব ও তাৎপর্য
ইমাম আওযায়ী রহ. (মৃত্যু ১৫৭ হি.) বলেছেন:
"كان هذا العلم شيئا شريفا، إذا كان من أفواه الرجال، يتلاقونه ويتذاكرونه. فلما صار في الكتب، ذهب نوره، وصار إلى غير أهله (جامع بيان العلم وفضله،جـ১ صـ৯৮)
“এই হাদীসের চর্চা যখন মানুষের মুখে মুখে ছিলো, দেখা-সাক্ষাত হলেই পরস্পরে হাদীস পর্যালোচনা করতো, তখন হাদীসের মর্যাদা ছিলো, গুরুত্বও ছিলো। কিন্তু যখনই হাদীসকে কাগজের পাতায় আবদ্ধ করা হলো, চলে গেলো এর নূর, অনুপযুক্তরা হয়ে গেলো ধারক-বাহক”। তাঁর উপর আল্লাহর রহম ঝরুক! প্রেক্ষাপট যেটাই হোক, মৌলিকভাবে তাঁর বক্তব্যের ভাবটা অনেক গভীর! কী অন্তর্দৃষ্টি! কত ফিরাসাত! বলে গিয়েছেন ১৩০০ বছর আগেই!

         তাই তো হচ্ছে! তাকে-সেল্ফে কত কিতাব! কুতুবখানায় শত শত পান্ডুলিপি! দেশ-বিদেশে হাজার হাজার কিতাবের আমদানি-রপ্তানি! নুসখার কত ধরণ! কিন্তু সে অনুপাতে কি স্মৃতির এলবামে রক্ষিত আছে রাসূলের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মুখনিঃসৃত নূরানী শব্দগুচ্ছের পর্যাপ্ত সঞ্চয়ন? মুখের সাবলীলতায় কি মুক্তা হয়ে ঝরে রাসূলের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) পবিত্র কথামালা?

         কাগজের পাতায় তো হাদীসের শব্দ-নকশা সংরক্ষণ করা যায়, কিন্তু সুকোমল অন্তর ও মস্তিষ্ক ছাড়া হাদীসের ভাব, মর্ম এবং নূর ও মহত্ত¡ ধারণ করার মত উপযুক্ত কোন মাধ্যম কি আছে? অথচ হাদীস ধারণের উপযোগী মাধ্যমই হল, কলব। বলা হয়েছে।
وأما سنَّةُ النبيِّ - صلى الله عليه وسلم -: فإنّها كانتْ في الأمَّةِ تُحفظ في الصدورِ كما يُحفظ القرآنُ.
(تفسير بن رجب الحنبلى)
বস্তুত: উম্মাতের মাঝে সুন্নাতে নববীর সংরক্ষণ হতো, কুরআনের মতো বুকে ধারণ করেই।

         মানবজাতির আত্মার খোরাক, মহান রাসূলের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) পবিত্র বাণীগুলো কি শুধু উন্নত কাগজ আর সর্বাধুনিক প্রযুক্তির পেটে জমা করলেই আত্মিক ক্ষুধা নিবারণ হয়ে যাবে? নাকি মুখস্থ ও মর্ম অনুধাবনের মাধ্যমে আত্মার ক্ষুধা নিবারণের ব্যবস্থাও করতে হবে? সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে হাজার হাজার ড্রাম তেল মজুদ করা হচ্ছে, অথচ গাড়ির ইঞ্জিনগুলো তেলশূন্য, তাহলে গাড়িগুলো কি কোনো শক্তি পাবে? ড্রামে মজুদ তেল আছে বলেই কি গাড়িগুলো চলতে পারবে? নাকি গাড়ির ইঞ্জিনেও তেল ঢালতে হবে?

আসলে, “(হাদীস সংকলন ও গ্রন্থনা) এর উদ্দেশ্য এই ছিলো না যে, ইলম-অন্বেষীরা তাদের স্মৃতিশক্তিকে অকেজো করে সম্পূর্ণ গ্রন্থ-নির্ভর হয়ে পড়–ক; বরং উদ্দেশ্য ছিলো, দ্বীনী ইলম ও ফন- মনীষীদের স্মৃতির পাতার সাথে সংরক্ষিত হোক গ্রন্থের পাতাতেও, যাতে পঠন-পাঠন এবং চর্চা ও ধারণ সহজ হয়। অতএব সালাফের এই মহান খেদমতের কদরদানী করা এবং তালীম ও তাদরীসের পাশাপাশি হিফজের সিলসিলা জারি রাখাও আমাদের কর্তব্য। কেননা এসব গ্রন্থনা ও মুদ্রণ তো হিফজকে সহজ করার জন্য, হিফজ থেকে বিমুুখ হওয়ার জন্য নয়”। (মাকতাবাতুল আশরাফ কর্তৃক প্রকাশিত ‘হাদীসের আলো’ কিতাবের ভূমিকা, শায়খ আব্দুল মালেক হাফিজাহুল্লাহু)

          মাওলানা মানাযির আহসান গিলানী রহ. (মৃত্যু ১৩৭৫ হি.) স্পষ্ট করেই বলেছেন: “হাদীস সংরক্ষণের ক্ষেত্রে লিপিবদ্ধকরণকে অত্যাধিক গুরুত্ব দেয়া এবং মুখস্তকরণকে সীমাতিরিক্ত অবহেলা করা- কিছুতেই উচিত নয়। দুই পদ্ধতির কোন একটির প্রতি যত বেশি অমনোযোগিতা প্রদর্শন করা হবে, এর প্রতি মানুষের অনাগ্রহ সৃষ্টি হবে তত বেশি এবং দিন দিন গুরুত্বও কমে যাবে, মানুষ তখন স্বাভাবিকভাবেই হাদীস থেকে উপকার বঞ্চিত হতে থাকবে”। (‘تدوين حديث’ নামক কিতাবে ১৯২ নং পৃষ্ঠায় ‘محض كتابت كو حفاظت كامله كا ذريعه سمجهنا ناداني هى’ শিরোনামে লিখিত একটি দীর্ঘ আলোচনার ভাবমর্ম)

         হাদীসের উৎস- রাসূলের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) পবিত্র জবানে হয়ত হিফ্জুল হাদীসের গুরুত্বের প্রতিও ইশারা করে বলা হয়েছে:
نضّر الله عبدا سمع مقالتي، فوعاها وحفظها وبلغها فرب حامل فقه إلى من هو أفقه منه.
“যে আমার হাদীস শুনেছে অতপর মুখস্থ ও হেফাজত করেছে, এবং অনবগত অন্যকে তা পৌঁছে দিয়েছে, আল্লাহ তায়ালা তাকে প্রফুল্ল করবেন”। এখানে সুসংবাদ হাদীস হিফজের পুরস্কার, অন্যের নিকট পৌছিয়ে দেয়ার জাযা- হিফ্জুল হাদীসের সাধকদের জন্য।

হাদীসের ব্যাখ্যায় হিফজুল হাদীসের গুরুত্ব সম্পর্কে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে।
من الأمور المهمة للعالم وطالب العلم إتقان حفظ العلم والحديث؛ فقد دعا النبي صلى الله عليه وسلم بالنضرة لمن أتقن حفظ الحديث وبلغه كما سمعه، فعلى طالب العلم أن يحرص على حفظ الحديث، ولا يكون ذلك إلا بتكراره ودوام مراجعته. (شرح سنن أبي داؤد للعباد)
“হিফজুল ইলম ও হিফজুল হাদীসের ক্ষেত্রে দৃঢ়তা অর্জন করা আলেম ও তালিবে ইলমের উপর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বসমূহের মধ্যে অন্যতম। কেননা যারা ভালোভাবে হাদীস মুখস্থ করবে এবং হুবহু তা অন্যকে পৌছিয়ে দিবে রাসূল সা. তাদের জন্য প্রফুল্লতার দোয়া করেছেন। সুতরাং তালিবে ইলমের মধ্যে হিফজুল হাদীসের প্রতি আগ্রহ থাকতেই হবে। আর তা (হিফজুল হাদীস) তাকরার-তামরীন ও নিরবিচ্ছিন্ন পড়াশোনা ছাড়া অসম্ভব।”

      সাহাবায়ে কেরামও হাদীস মুখস্থ করেছেন, পরবর্তীদের কাছে পৌছিয়েও দিয়েছেন এবং বলেছেন:
إن نبيكم صلى الله عليه وسلم كان يحدثنا فنحفظ، فاحفظوا كما كنا نحفظ.
(جامع بيان العلم وفضله، جـ১ صـ৬৪)
“তোমাদের নবী আমাদেরকে হাদীস বলতেন, আমরা মুখস্থ করতাম। অতএব আমরা যেভাবে হাদীস মুখস্থ করতাম, তোমরাও সেভাবে হাদীস মুখস্থ করো”।

       হযরত আলী রাযি. (মৃত্যু ৪০ হি.)  তাঁর ছাত্রদেরকে বলতেন:
أكثرو ذكر الحديث فإن لم تفعلوا يدرس علمكم. (جامع بيان العلم وفضله، جـ১ صـ১০১)
“তোমরা বারবার হাদীস অনুশীলন করো, যদি তা না করো, তবে তোমাদের হাদীসের ইলম শেষ হয়ে যাবে।

       আলহামদুলিল্লাহ! কাগজের আশ্রয়ে তো যুগ পরম্পরায় হিফজুল হাদীসের এই নির্দেশনা আমাদের পর্যন্ত পৌছেছে, কিন্তু কলব, মেধা ও আমলের মাধ্যমে হিফ্জুল হাদীসের সাধনায় কি ‘সালাফ’কে অনুসরণ করা হচ্ছে? আসলে হিফজুল হাদীসের ক্ষেত্রে আমাদের তৎপরতাগুলো কী কী? এবং কতটুকু? সামনের ‘দৃশ্যপটগুলো’তে চিন্তার খোরাক আছে  হয়ত।


হিফজুল হাদীস ও কয়েকটি দৃশ্যপট
এক-
         ম্যাগাজিনের একটি ঘোষণা। ‘হিফজুল হাদীস প্রতিযোগিতা’। হাদীস সংখ্যা মাত্র ১০০টি। পুরস্কার কী ছিলো; মনে নেই, তবে মানসম্পন্ন ছিলো। প্রবল ইচ্ছা জাগলো, অংশগ্রহণ করবো। হাদীস মুখস্থ শুরু করলাম। এক এক করে দুদিনেই সব মুখস্থ হয়ে গেলো। প্রতিযোগিতার ৮ দিন বাকী; ভাবলাম, সময় আছে, তেমন পড়লাম না। প্রতিযোগিতার আগের দিন মুখস্থকৃত হাদীসগুলো স্মরণ করতে চাইলাম, আর স্মরণ হলো না। মুখস্থের আগের মতই পারলাম না। মন ভেঙ্গে গেলো। প্রতিযোগীদের তালিকা থেকে নাম কেটে নিলাম। হাদীসও মুখস্থ হলো না, প্রতিযোগিতায়ও অংশগ্রহণ হলো না। হাদীস মুখস্থের আগ্রহটাতেই ভাটা পড়ে গেলো। একটি উপলক্ষ্যে কিছু হাদীস মুখস্থ হতো, অবশেষে আর হলো না।
 

দুই-
         বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে পেলাম, ‘হিফজুল হাদীস প্রতিযোগিতা’। হাদীস সংখ্যা মাত্র ৬২৬। প্রথম ও দ্বিতীয় পুরস্কার হজ্জ। তৃতীয় পুরস্কার ওমরা। লোভনীয় অফার। দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করলাম; প্রতিযোগিতায় অংশ গ্রহণ করবোই। হাদীস মুখস্থ করবোই। শুরু করলাম। এক ঘন্টায় ৮/১০ হাদীস মুখস্থ! অথচ দুঃখজনক সত্য, দু’এক ঘন্টা পরে একটিও মনে থাকে না। এভাবেই হিফজ করতে লাগলাম। ২ সপ্তাহে প্রায় ৪০০ হাদীস মুখস্থ! হাদীস পড়ার সময় মনে হয়; সব মুখস্ত হয়ে গিয়েছে। কিন্তু সামান্য বিরতিতে আবার ভুলে যাই। মুখস্থের কোন স্থায়িত্ব হয় না। এভাবে বিরক্তি বাড়তে থাকে, এক সময় কিতাবাদি তুলে রেখে মুখস্থ বন্ধ। হজ্জ ও ওমরা তো দূরের কথা, প্রতিযোগিতায়ও অংশগ্রহণ হলো না, হাদীসও মুখস্থ হলো না।

তিন-
         মাদরাসায় বিভিন্ন বিষয়ে প্রতিযোগিতার ঘোষণা হলো। অন্যতম বিষয় ছিলো ‘হিফজুল হাদীস’। ছাত্রদেরকে; বিশেষ করে মেধাবীদেরকে বললাম, হিফজুল হাদীসের অংশ গ্রহণ করো। পুরস্কার না পেলেও লাভ। হাদীস তো মুখস্ত হবে। এটাই তো বড় সম্পদ। দু’একজন ছাড়া কেউ রাজি হলো না। তবে এই ছাত্ররাই বিতর্কের মত কঠিণ বিষয়ে অংশ গ্রহণ করে সবাইকে চমক লাগিয়ে দিয়েছে। জিজ্ঞেস করলাম: হিফজুল হাদীসে তোমাদের অনাগ্রহ কেন? উত্তর এলো; হাদীস মুখস্থ করতে পারলেও ইয়াদ রাখতে পারি না।

চার-
         খেদমতের প্রথম বছর। কোন এক জামাতের প্রথম সারির ৭/৮ জন ছাত্রকে বললাম: প্রতিদিন একটি করে হাদীস মুখস্থ করবে, এরপর মুখস্থকৃত হাদীসটা খাতা বা ডায়েরীতে লিখবে। সবশেষে আমাকে শোনাবে। তারা আগ্রহের সাথে প্রতিদিন হাদীস মুখস্থ করতো, ডায়েরীতে লিখতো এবং শোনাতো। খুব ভালো লাগতো। এভাবে ৩/৪ সপ্তাহ। ধীরে ধীরে ওদের আগ্রহ কমে গেলো। আমার আগ্রহও ধরে রাখতে পারলাম না। এরপর যেই সেই। মনে হলো, ‘হিফজুল হাদীস’ বলতে কোন কিছুই দুনিয়া নেই এবং ছিলোও না। আলইয়াজুবিল্লাহ!

পাঁচ-
         দুই বছর দরসী কিতাবের তাকসীমে হেদায়া আউয়াল ছিলো। ছাত্রদেরকে বললাম: ইখতিলাফের সাথে দলিলগুলোও মুখস্থ করো, অন্তত নিজেদের আমলের দলিলগুলো। কারণ, বর্তমানে আমাদের আমলী মাসায়েলের ক্ষেত্রে যে সব মতানৈক্য প্রচলিত, তা কিন্তু মাযহাবি ইখতিলাফ নয়। বরং হাদীসের নামে ইখতিলাফ। সুতরাং অন্তত নিজেদের আমলের দলিলগুলো মুখস্থ করো। মনে হচ্ছে, বর্তমানে মাযহাবি ইখতিলাফ জানার চেয়ে ‘হাদীসের দলিল’গুলো জানা কম গুরুত্বের নয়। যাক, ছাত্রদেরকে মাসআলা সম্পৃক্ত হাদীসগুলো মুখস্থ করানো হতো। তারাও ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় মুখস্থ করতো, চেষ্টা করতো,  কিন্তু অন্যান্য দরসী কিতাবের চাপে তেমন মুজবুতির সাথে হিফজ করা সম্ভব হতো না।

ছয়-
         কখনো কখনো আলোচনা করতে বলা হয়। তাই মনে মনে বিষয় নির্ধারণ করি। কিন্তু বিষয় সংশ্লীষ্ট হাদীস মুখস্থ থাকে না। তাই প্রস্তুতিমূলকভাবে দু’চারটি হাদীস মুখস্থ করতে চেষ্টা করি। মুখস্থও হয়। তবে আলোচনার সময় হাদীসের মতন স্মরণে আসে না। তখন ‘নিজের ভাষাতেই’ বলতে হয়, রাসূল স. হাদীসে এমন এমন বলেছেন। তবে এতে মনে তৃপ্তি আসে না। বরং একধরণের অপরাধবোধ কাজ করে। এতদিনে এই শিখলাম! বিষয়ভিত্তিক দু’চারটি হাদীস মুখস্থ নেই! নিজেকে ধিক্কার দেয়া ছাড়া কী করার আছে?

সাত-
         আলোচনায় মাঝে মাঝে হাদীস বলতে পারি। তবে শৈশবের নূরানীর সে সব হাদীস, যা দিনের পর দিন অসংখ্যবার সব সাথী মিলে দলবেধে পড়তাম। আলোচনায় বারবার ঘুরে ফিরে সেই নূরানীতে মুখস্থকৃত হাদীসগুলোই। জুমার খুৎবাটাও এ সব হাদীস দিয়ে চালিয়ে দিচ্ছি বছরের পর বছর। এত বছর ইলমের পিছনে ব্যয় করে; সেই শৈশবের দু’চারটি হাদীসই শেষ সম্বল! নিজের প্রতি প্রচন্ড আক্ষেপ হয়।

আট-
         অনেক সময় বলা হয়: হুজুর আপনারা এভাবে নামাজ পড়েন, দলিল কী? বলি: এভাবেও হাদীসে আছে। তখন জানতে চাওয়া হয়, কী সেই হাদীস? মতন বলতে পারি না। লজ্জাবোধ হয়। আবার অনেকে চোখের সামনে হাদীস নাম্বার বলে বলে দলিলের ফেরি করে বেড়ায়, চেয়ে থাকি, তেমন কিছু বলার হিম্মত হয় না। কিছু বলে কোন ঝামেলায় পড়ে যাই কিনা! কারণ, আমার তো হাদীস নম্বরও নেই, নসও মুখস্থ নেই।

নয়
         দরসে নেজামীর মেশকাত-দাওরাতে যেভাবে হাদীসের দরস-তাদরীস হয়। তাতে হাদীস মুখস্থ করা তো প্রায় অসম্ভব। মেশকাতের আগে কোন কোন জামাতে বিশেষ দু’একটি হাদীসের কিতাব থাকলেও বিভিন্ন কারণে সেগুলোর গুরুত্ব নেমে যায় অতিরিক্ত বিষয়ের স্তরে। তালিবে ইলম মনে চাইলে পড়বে, না হয় না পড়বে। ইচ্ছা হলে মুখস্থ করবে, না হলে না করবে। পরীক্ষা কেন্দ্রীক কিছু হাদীস মুখস্থ হয়, তাও পরীক্ষার পরেই শেষ। অধিকাংশ এদারাতে এমনটাই বাস্তবতা। দীর্ঘ এক যুগের একশো পঞ্চাশ মাসেও ১৫০টি হাদীস আমি ঠিক মত মুখস্থ করতে পারি নি।
 

দশ
         একবার বড়ো এক শায়েখ এলেন মাদরাসায় । হাদীস সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ নসীহত করলেন, উৎসাহ-উদ্দীপনা দিলেন। অনেকের ভিতর প্রচুর প্রভাব পড়লো। সে দিন থেকে দেখা গেলো বহু ছাত্র স্ব-উদ্যোগে হাদীস মুখস্থ শুরু করছে। কিন্তু এভাবে বেশি দিন গেল না। ধীরে ধীরে হাদীস মুখস্থ বন্ধ হয়ে গেল। কারো ২ দিন, কারো ৩ দিন, ৫ দিন, ৬ দিন পর হাদীস মুখস্থের আগ্রহ স্থিমিত হয়ে গেলো।

এগারো
         এত নং হাদীসে এটা। তত নং হাদীসে সেটা। বক্তা মুখে ফেনা তুলে ফেলেছেন। শ্রোতারা অবাক! এত দলিল কিভাবে সম্ভব? সেখানে আমি সে বক্তার পরের বক্তা। আমি হাদীস নম্বরও শিখিনি, মতনও শিখিনি। তাই না বলতে পারলাম হাদীস নম্বর, না পারলাম নস। শ্রোতারা আমার পূর্ব বক্তার প্রতিই বেশি আস্থাশীল হলো। অথচ বাস্তবতা তো হল, তিনি হাদীস বলেননি, বলেছেন শুধু নম্বর। হুবহু রাসূলের সা. ভাষা আরবিতেও হাদীস বলতে পারেন নি, বলেছেন নিজের মতো করে, নিজের ভাষায় হাদীসের নামে কিছু বাক্যমালা। অথচ শ্রোতের দৃষ্টিতে তিনিই মুহাক্কিক-মুহাদ্দিস আলেম। আর আমি প্রথাসর্বস্ব আলেম। হাদীস না জানা বিদা’তি আলেম।

বারো
         তালীম ও তাআল্লুমের যামানার অভিজ্ঞতা হল, বহু তালিবে ইলমের ইলমী যওক প্রসংশনীয়। ব্যক্তিগতভাবে হাদীস হিফজ করেন। প্রচুর মেহনত করেন। তবে পরিবেশ না থাকার কারণে, সেটা ব্যাপকভাবে লক্ষ্য করা যায় না। অনেকে স্বেচ্ছায় হাদীস মুখস্থ করলেও তা দীর্ঘদিন ধরে রাখার মত মুখস্থ করতে পারেন না। কারণ, হিফজুল হাদীসে মেহনতের তেমন কোন হিম্মত খুজে পান না, পান না সহায়ক কোন ব্যবস্থা, সাথী বা পরিবেশ। ফলে শেষমেশ হিফজুল হাদীসে আগ্রহ টিকে থাকে না। বেশি দূর আর এগুতে পারেন না।

তেরো
         আমি কুরআন-হাদীসের জন্য এক যুগেরও অধিক সময় ব্যয় করেছি, তা সত্তে¡ও প্রয়োজনের মুহুর্তে নির্ধারিত বিষয়ে তৎক্ষণাৎ দু’একটি হাদীসের ইবারত হুবহু মুখস্থ বলতে পারি না। হাদীসের সূত্র বলতে না পারি। মাঝে মধ্যে দু’একটা হাদীস বলতে পারি, তবে অধিকাংশই যে ‘জনশ্রæত’।

চৌদ্দ
         “আমাদের দেশে হিফজুন নুসুসÑ কুরআন-হাদীসের টেক্সট মুখস্থের গুরুত্ব কম বা নাই বললেই চলে। কওমি-আলিয়া উভয় সিলেবাসে নসের গুরুত্ব অনেক কম। যে কারণে আলেমসমাজ দলিল জানেন কম। ফিকহের চর্চা থাকলেও সে অনুপাতে হাদীস মুখস্থ করার প্রবণতা নাই বললেই চলে।”
-‘বিষয়ভিত্তিক হাদিস’ কিতাবের ভূমিকা। প্রকাশক, মাদরাসাতুল মানসুর বাংলাদেশ।

পনেরো
         “কিছু লোক আছে, যাদেরকে আলেম বলা হয়, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তারা আলেম নন। কারণ, তাদেরকে কিছু জিজ্ঞাসা করা হলে বলে জ¦ী, এ বিষয়ে আমার কাছে তথ্য আছে, তবে কিতাবের সিন্দুকে!!”
বলেছেন: ইমাম আব্দুল মালেক ইবনে কুরাইব রহ. (২১৬ হি.)। ‘জামিউ বায়ানিল ইলমি ওফাযলিহি’র সূত্রে ‘হাদীসের আলো’।

খুলাসা
         বর্ণিত চিত্রগুলোর অধিকাংশই আমার মাঝে বিদ্যমান। আর এমনটা হওয়াই স্বাভাবিক, যেহেতু আমি মানুষ। এর একটি অনস্বীকার্য কারণ এটাও হতে পারে, হাদীসের নস মুখস্থ করার জন্য সুনির্ধারিত, সুপরিকল্পিত ও পর্যাপ্ত সময়ের বরাদ্দ আমার ইলমি জিন্দেগীর সূচিতে বিশেষভাবে নেই। শৈশব ও তারুণ্যের প্রখর স্মৃতিশক্তিও যথাযথ ব্যবহৃত হচ্ছে না ‘হিফ্জুল হাদীসে’র জন্য। কখনো স্ব-উদ্যোগে কিছু হাদীস মুখস্থ করলেও, পর্যাপ্ত অনুশীলন, ধারাবাহিক চর্চা ও পরিবেশ না থাকায়; সেগুলো যথাযথভাবে স্মৃতিতে আটকে রাখা সম্ভব হয়ে উঠছে না। হয়ত এ সব কারণে হিফজুল হাদীসের সাধনাটা ব্যাপক ও কার্যকরি হয়ে উঠছে না। ‘হিফজুল হাদীসে’র ক্ষেত্রে উদাসীনতা কিংবা হিফজের পরে তা স্থায়িত্বের জন্য কার্যকরি প্রচেষ্টা না থাকা আমার ‘ইলমী পরিচয়ে’র সাথে কিছুতেই সঙ্গত নয়।

তাই হিফজুল হাদীসের স্থায়িত্বের জন্য প্রয়োজন এমন পদ্ধতি ও পরিবেশ, যা হিফজের আগ্রহ ও হিম্মতকে ধরে রাখবে এবং হিফজের  স্থায়িত্বে সহায়ক হবে। এ ক্ষেত্রে অন্তত চেষ্টা-সাধনা ও ফিকির করে তো দেখা যেতে পারে। কারণ, এ যুগেও কোন মুসলিম হাদীস মুখস্থের প্রয়োজনীয়তাকে অস্বীকার করেন না, এমনটা কল্পনাও করা যায় না। তাই তো ব্যক্তিগতভাবে বিভিন্ন জন বিভিন্নভাবে হাদীস মুখস্থ করে থাকেন। অবশ্য তা একেবারে নগণ্য। সময়ের চাহিদায় বৃহৎ পরিসরে যেভাবে হাদীস হিফ্জের প্রয়োজন, তা পূরণ হওয়ার মত কোন পদ্ধতি বা ব্যবস্থাপনাও লক্ষ্য করা যাচ্ছে না।

এমন বহু চিন্তা-ফিকির, সাধ্য অনুযায়ী মুতালা’আ, নিজে নিজে হাদীস মুখস্থের চেষ্টা-ব্যর্থতা, তালিবে ইলমদেরকে হাদীস মুখস্থ করানোর বিভিন্ন কৌশল, বড়দের নির্দেশনা, কার্যক্রম ইত্যাদি বিবেচনায় রেখেই চলছিল হিফজুল হাদীস ভাবনা। এক পর্যায়ে সকল ভাবনাকে স্থির করে দিলো একটি চমৎকার নির্দেশনা। হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ রহ. (মৃত্যু ১০১ হি.) কর্তৃক নিয়োজিত আফ্রিকার গভর্ণর মুহাদ্দিস হযরত ইসমাঈল ইবনু উবাইদুল্লাহ রহ. (মৃত্যু ১৩১ হি.) বলেছেন:  
-بنبغي لنا أن نحفظ حديث رسول الله صلىـ كما يُحفظ القرآن. تاريخ دمشق، جـ৮-
“আমাদের উচিত, কুরআন যেভাবে মুখস্থ করা হয়, সেভাবে হাদীসও মুখস্থ করা”।

নির্দেশনাটি সামনে আসার পর থেকে এলোমেলো ভাবনাগুলো একটি সুনির্দিষ্ট ভাবনায় কেন্দ্রীভ‚ত হতে থাকলো, ‘হিফজুল হাদীসে’র মেহনতটিও পরিকল্পিত একটি রূপরেখা ও কাঠামোতে বিন্যস্ত করার একটি চিন্তা মাথায় আসলো। বিশেষ করে, এ যুগে যেহেতু ‘ব্যক্তিকেন্দ্রীক’ শিক্ষার ধারাটা একদম অপরিচিত, ‘প্রতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা’টাই বেশি গ্রহণীয়, তাই ‘হিফজুল হাদীসে’র ক্ষেত্রেও একটি প্রতিষ্ঠানিক কাঠামো জরুরী ও গুরুত্বপূর্ণ মনে হলো। এভাবেই ‘হিফজুল কুরআনের আলোকে হিফজুল হাদীস’ পদ্ধতির ধারণা, পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা।

‘হিফ্জুল কুরআনের আলোকে হিফজুল হাদীস’

         আলহাম্দুলিল্লাহ্! হিফ্জুল কুরআনে মুসলিম উম্মাহ্র দৃষ্টান্ত বিস্ময়কর। যদিও এটা আল্লাহ তা’য়ালার বিশেষ কুদরতের প্রকাশ ও রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর শ্রেষ্ঠ মু’জেজা। তাই বলে কি হিফ্জুল কুরআনের পদ্ধতি হিফ্জুল হাদীসের ক্ষেত্রে অনুসরণীয় হতে পারে না? এ পদ্ধতি কি ফলপ্রসূ হবে না? আশা করা যায়, অবশ্যই হবে এবং অন্যান্য পদ্ধতির চেয়ে বেশিই কার্যকরি হবে। সালাফের জীবনীতে তো তাই পাওয়া যায়।

         “সাহাবায়ে কিরাম রা. রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর হাদীসগুলো হুবহু মুখস্থ করার ব্যাপারে যতœবান ছিলেন। তাকরার বা পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে তাঁরা তা হুবহু শব্দে মুখস্থ রাখার চেষ্টা করতেন। শিশুরা যেমনিভাবে কুরআন-কবিতা মুখস্থ করে, সাহাবায়ে কিরামও রাত জেগে জেগে তেমনিভাবে হাদীস মুখস্থ করতেন- এমন বহু ঘটনা ইতিহাসের পাতায় বিদ্যমান রয়েছে”। (আবুল ফাতাহ মুহা. ইয়াহইয়া রহ. কৃত হাদীস অধ্যয়নের মূলনীতি)

         হিফজুল হাদীসে মুহাদ্দিসগণও (রহ.) হিফজুল কুরআনের অনুসরণ করেছেন। আবু আলী নিসাপুরী রহ. (মৃত্যু ৩৪৯ হি.) বলেছেন:
كان ابن خزيمة يحفظ الفقهيات من حديثه كما يحفظ القاري السورة.
(تذكرة الحفاظ، جـ২ صـ২৬১)
“ইমাম ইবনে খুজাইমা রহ. (মৃত্যু ৩১১ হি.) ফিকাহ বিষয়ক হাদীসগুলো এমনভাবে মুখস্থ করতেন, যেভাবে কারীগণ কুরআনের সূরা মুখস্থ করে থাকেন”।

         ইসরাঈল ইবনে ইউনুস রহ. (মৃত্যু ১৬২ হি.) তাঁর দাদার বর্ণিত হাদীসের ব্যাপারে বলতেন:
كنت أحفظ حديث أبي إسحاق كما أحفظ السورة من القرآن. (تذكرة الحفاظ، جـ২ صـ১৯৯)
“আমি আবু ইসহাক (মৃত্যু ১২৬ হি.) থেকে বর্ণিত হাদীসগুলো কুরআনের সূরা মুখস্থ করার মত মুখস্থ করতাম”।

         শাহ্র ইবনে হাওশাব রহ. (মৃত্যু ১১১ হি.) সম্পর্কে বলা হয়েছে:
كان يحفظها (الأحاديث) كأنه يقرأ سورة من القرآن. (تهذيب التهذيب، جـ৩ صـ৩৪৮)
“তিনি হাদীসসমূহ এমনভাবে মুখস্থ করতেন বা পড়তেন, মনে হতো যেন কুরআনের সূরা পড়তেন”।

         আবুয যিক্র মুহাম্মদ রহ. (মৃত্যু ৩২০ হি.) সম্পর্কে বলা হয়েছে:
أبو الذِكر محمد رحمه الله تعالى كان مالكي المذهب، من أهل العلم، والحفظ لكتب أبيه من حفظه. وكان يحفظها كما يحفظ القرآن. (ترتيب المدارك وتقرير المسالك)
“তিনি তাঁর বাবার কিতাবগুলোর হাফেজ ছিলেন। সেগুলো তিনি হিফজুল কুরআনের মত করেই মুখস্থ করতেন।”

         মুহাম্মদ ইবনে সুহ্সূন রহ. (মৃত্যু ২৫৬ হি.) সম্পর্কে বলা হয়েছে:
ذكر أنه مستظهر المدوّنة، وكتبها في اللوح، وحفظها كما يحفظ القرآن.
(ترتيب المدارك وتقرير المسالك)
“বিভিন্ন নথিপত্রও তাঁর মুখস্থ ছিলো। সেগুলো আবার তিনি কাঠ ইত্যাদিতে লিখে রাখতেন এবং হিফজুল কুরআনের মতই মুখস্থ করেছেন।”

         হযরত ইবনে কুতাইবা রহ. (মৃত্যু ৩২৪ হি.) সম্পর্কে বলা হয়েছে:
كَانَ يَحْفَظُ كُتُبَ أَبِيْهِ كُلَّهَا بِالنَّقْطِ وَالشَّكلِ كَمَا يَحْفَظُ القُرْآنَ، وَهِيَ أَحَدٌ وَعِشْرُوْنَ مُصَنَّفاً، فَلَمَّا سَمِعَ بِذَلِكَ أَهْلُ الأَدَبِ وَالعِلْمِ، جَاؤُوهُ، وَجَاءهُ أَوْلاَدُ المُلُوكِ، فَأَخَذُوا عَنْهُ.
(سير أعلام النبلاء)
“তিনি তাঁর বাবার লিখিত কিতাবগুলো হারাকাতসহ এমনভাবে মুখস্থ করেছেন, যেভাবে কুরআন মুখস্থ করে। তাঁর বাবার লিখিত কিতাব ছিল ২১ টি। যখন আলেম ও সাহিত্যিকগণ এ কথা শুনলেন; তাঁর কাছে আসতে লাগলেন। এমনকি দেশের সাধারণ মানুষজনও আসতে লাগলো। তাঁর কাছ থেকে ইলম অর্জন করতে লাগলো।”

         হযরত মামুন ইবনে মহাম্মদ সূফী রহ. সম্পর্কে বলা হয়েছে:
كان يحفظ الكتب الستة كما يحفظ القرآن.  (محمد الحسن الددو الشنقيطي)
“তিনি হিফজুল কুরআনের মতো করেই কুতুবে সিত্তা হিফজ করতেন।”

হযরত আবু হুরায়রা রা. বলেছেন:
إِنِّى لأُجَزِّئُ اللَّيْلَ ثَلاَثَةَ أَجْزَاءٍ فَثُلُثٌ أَنَامُ وَثُلُثٌ أَقُومُ وَثُلُثٌ أَتَذَكَّرُ أَحَادِيثَ رَسُولِ اللَّهِ
(سنن الدارمي)
“আমি তিনভাগে রাত কাটাই। একতৃতীয়াংশ ঘুমে। আরেক তৃতীয়াংশ ইবাদাতে। শেষ তৃতীয়াংশ রাসূলের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) হাদীসের পূণর্পাঠে”।

         এমনকি হিফজুল হাদীসের মনযোগ-একাগ্রতা ও কষ্ট-মুজাহাদার বর্ণনা দিতে গিয়ে আবু হুরায়রা রা. নিজেই বলেছেন:
إنكم تزعمون أن أبا هريرة يكثر الحديث عن النبي صلى الله عليه وسلم، أني كنت امرأ مسكينا صحبت النبي صلى الله عليه وسلم على ملء بطني وكان الـمهاجرون يشغلهم الصفق في الأسواق وكانت الأنصار يشغلهم القيام على أموالـهم
(الحديث والمحدثين صـ১১৭)
“তোমরা সন্দেহ করছো, আবু হুরায়রা এত হাদীস (কিভাবে) বর্ণনা করে?  (শোন!) আমি ছিলাম নিঃস্ব এক লোক। খালি পেটেই পড়ে থাকতাম রাসূলের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) দরবারে। এদিকে মুহাজিরগণ ব্যস্ত থাকতেন ব্যবসা-বাণিজ্যে, আর আনসারগণ চাষাবাদে”। ৭ম হিজরীতে ইসলাম গ্রহণের পর থেকে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর ইন্তেকাল পর্যন্ত; লাগাতার ৪ বছর একাগ্রতার সাথেই পড়ে থেকেছেন রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর সান্নিধ্যে, হিফ্জুল হাদীসের জন্য।

         বর্তমানে হিফ্জুল কুরআনে তো তাই করা হচ্ছে, সকল ব্যস্ততা থেকে অবসর হয়ে লাগাতার কয়েক বছর হিফ্জুল কুরআনের জন্য ওয়াক্ফ করা হচ্ছে। হিফ্জুল হাদীসের প্রবাদপুরুষ আবু হুরায়রা রা. এর অনুসরণে এ যুগেও যদি হাদীস মুখস্থের ব্যবস্থা করা হয়, আশা করা যায় উপকারশূন্য হবে না। ইনশাআল্লাহ!

         হয়ত হিফ্জুল কুরআনের তৎকালীন পদ্ধতি এবং প্রচলিত পদ্ধতি হুবহু সাদৃশ্যপূর্ণ নাও হতে পারে। কিন্তু বর্তমান হিফ্জুল কুরআনের পদ্ধতি তো সুদীর্ঘ সময়ের পরীক্ষিত পদ্ধতি এবং সবার কাছে পরিষ্কার। দৃঢ়ভাবে আশা করা যায়, এই পদ্ধতিতে ‘হিফ্জুল হাদীস’ এর চর্চা হলেও বিফল হবে না। ইনশাআল্লাহ! এমন আশাবাদ ও আইম্মায়ে হুফ্ফাজের জীবন সিঞ্চিত পদ্ধতি সামনে রেখেই এ যুগেও “হিফজুল কুরআনের আলোকে হিফজুল হাদীস” এর শুভযাত্রা। স্বাভাবিক, সাম্ভব্য, যৌক্তিক ও ভারসাম্যতাপূর্ণ পরিকল্পনায় প্রচলিত হিফ্জুল কুরআনের আলোকেই, পূর্ণ এক বছর মেয়াদী ‘হিফ্জুল হাদীসে’র যুগান্তকারি উদ্যোগ।

         আলহামদুলিল্লাহ! ২৯ রবিউস সানী ১৪৪১ হি. শুক্রবার বাদ আসর থেকে ১১ জন শিক্ষার্থীর মাধ্যমে ১ মাস ব্যাপী এই ‘হিফজুল কুরআনের আলোকে হিফজুল হাদীস’ এর পরীক্ষামূলক কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। এমনকি এর উপযোগিতা ও কার্যকারিতায় পূর্ণ আশ্বস্ত হয়ে বর্তমান শিক্ষাবর্ষ (শাওয়াল) ১৪৪১-১৪৪২ হিজরীতে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এক বছর মেয়াদী কার্যক্রম চালু করা হয়েছে। এ ব্যাপারে বিশেষভাবে ধারণা অর্জনের জন্য হিফজুল হাদীস বিভাগের শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতাসমৃদ্ধ লেখা ‘হিফজুল হাদীস ও কিছু পর্যবেক্ষণ’ নামক স্মারকটি সংগ্রহ করা যেতে পারে।

হিফজুল হাদীস ব্যবস্থাপনা : সবক, সাত সবক ও তামরীন
         হিফজের ক্ষেত্রে ইবনুল জাওযীর রহ. (মৃত্যু ৪৭৯হি.) একটি চমৎকার নির্দেশনা, যা হিফজখানাগুলোর প্রচলিত নিয়ম-কানুনের সাথে অনেকটাই সাদৃশ্যপূর্ণ। তিনি বলেছেন:
ينبغي لمن يريد الحفظ أن يتشاغل به في وقت جمع الهم، ومتى رأى نفسه مشغول القلب ترك الحفظ، ويحفظ قدر ما يمكن، فإن القليل يثبت، والكثير لا يحصل، وقد مدح الحفظ في السحر لموضع جمع الهم، وفي البكر، وعند نصف الليل.
(من أسباب تراجع الدرس الحديثيّ)
“কেউ যদি মুখস্থ করতে চায়, তাহলে যেন পূর্ণ মনোযোগের সময় মুখস্থ করে। আর যখন সে দেখবে; তার মন মুখস্থের প্রতি মনযোগী নয়, মুখস্থ করবে না। যতটুকু সম্ভব, ততটুকুই মুখস্থ করবে। অল্প পরিমাণে মুখস্থ স্থায়ী হয়। পরিমাণ বেশি হলে টিকে থাকে না। মধ্যরাতে, শেষ রাতে, সকালে মুখস্থ করার বিষয়টি প্রশংসনীয়, কারণ; সে সময়গুলো পূর্ণ মনোযোগের সময়।”

         তাই হিফজখানাগুলোর প্রচলিত নেযামুল আওকাত, নিয়মনীতির আলোকেই ব্যবস্থাপনা রয়েছে হিফজুল হাদীসের জন্য। পূর্ণাঙ্গ আবাসিক। লাগাতার এক বছর একাগ্রতার সাথে অর্থসহ হাদীস মুখস্তের কার্যক্রম চলমান। মূল রাবি ও মূল কিতাবের নামসহ সবক মুখস্থ করানো হয় হুবহু হিফ্জুল কুরআনের পদ্ধতিতেই, সাত সবকও তাই।

          তবে সবিনা ও আমুখতা পর্বে রয়েছে প্রশ্নোত্তর পদ্ধতিতে তামরীন। যেমন: বিষয় বলে হাদীস জানতে চাওয়া, বিষয় ও রাবির নাম বলে হাদীস জানতে চাওয়া, বিষয় ও মূল কিতাব উল্লেখ করে হাদীস জানতে চাওয়া। হাদীসের অংশ উল্লেখ করে পূর্ণ হাদীস জানতে চাওয়া। অর্থ উল্লেখ করে হাদীসের হুবহু ইবারত জানতে চাওয়া। নির্দিষ্ট কোন ছাত্র থেকেও জানতে চাওয়া হয়, আবার সম্মিলিতভাবে সবার কাছেও জানতে চাওয়া হয়। দৈনন্দিন এভাবে প্রচুর পরিমানে প্রশ্নোত্তরের আদলে তামরীন হচ্ছে। মৌখিকের পাশাপাশি লিখিত তামরীনও হচ্ছে। আলহাম্দুলিল্লাহ্।

‘হিফ্জুল হাদীস’ : দীর্ঘস্থায়ীর জন্য তামরীন’
         দু’একবার পড়ে মুখস্থ করলেই হাদীস দিলে গেথে যায় না, বরং মুখস্থের স্থায়িত্ব ও দিলে গাথার জন্য প্রয়োজন প্রচুর পরিমানে তামরীণ বা পূনরাবৃত্তি। সালাফের নির্দেশনাও অনেকটা এমনই। হযরত ইবনে আব্বাস রা. (মৃত্যু ৬৮ হি.) বলেছেন:
تذاكروا هذا الحديث، لا يتفلت منكم. فإنه ليس بمنزلة القرآن، القرآن مجموع محفوظ، وإنكم إن لم تذاكروا هذا الحديث يفلت منكم . ولا يقولن أحدكم : حدثت أمس ، لا أحدث اليوم . بل حدثت أمس وأحدث اليوم وأحدث غدا.
( شرف أصحاب الحديث للبغدادي)
“এই হাদীস নিয়ে তোমরা বেশি বেশি আলোচনা করো, যেন তোমাদের থেকে বিস্মৃত না হয়ে যায়। কেননা হাদীস কুরআনের সমপর্যায়ের নয়। কুরআন একত্রে সংকলিত এবং সংরক্ষিত। যদি তোমরা এ হাদীস বারবার না পড়ো, তাহলে ভুলে যাবে। তোমাদের কেউ যেন একথা না বলে, গতকাল হাদীসটি বর্ণনা করেছি, আজকে বর্ণনা করতে পারছি না। বরং এমন যেন হয়, গতকাল বর্ণনা করেছি, আজকেও বর্ণনা করছি, আগামীকালও বর্ণনা করতে পারবো।”

    হযরত ইবনে আব্বাস রা. আরো বলেছেন:
إذا سمعتم منا شيئا ، فتذاكروه بينكم. (شرف أصحاب الحديث للبغدادي)
“তোমরা যখন আমাদের থেকে কিছু শোন, তখন পরস্পর আলোচনা করো।”

          ইবরাহিম নাখয়ী রহ. (মৃত্যু ৯৫ হি.) তো তামরীনের গুরুত্ব দিতে গিয়ে ছাত্রদেরকে বলতেন:
مَنْ سَرَّهُ أَنْ يَحْفَظَ الْحَدِيثَ، فَلْيُحَدِّثْ بِهِ، وَلَوْ أَنْ يُحَدِّثَ بِهِ مَنْ لَا يَشْتَهِيهِ  ، فإنه إذا فعل ذلك كان كالكتاب في صدره. (الجامع لأخلاق الراوي وآداب السامع للخطيب)
“যে ব্যক্তি হাদীস মুখস্থ করে আনন্দ পেতে চায়, সে যেন তা অন্যের কাছে বর্ণনা করে, শুনতে না চাইলেও যেন বর্ণনা করে। কেননা যখন সে এমনটা করবে, তখনই সেটা (মুখস্থকৃত) তার অন্তরে লিখার মত গেঁথে যাবে।”

         হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. (মৃত্যু ৩২ হি.) বলেছেন:
تذاكروا الحديث فإن حياته مذاكرته. (معرفة علوم الحديث، صـ১৪১)
“তোমরা বারবার হাদীসের অনুশীলন করো। কারণ, হাদীসকে স্মৃতিতে সংরক্ষণের পদ্ধতি এটাই।”

         হযরত আব্দুর রহমান ইবনে আবি লায়লা রহ. (মৃত্যু ১৪৮ হি.) তাঁর ছাত্রদেরকে বলতেন:
إن إحياء الحديث مذاكرته فتذاكروا (جامع بيان العلم وفضله، جـ১ صـ১০১)
“হাদীসকে স্মৃতিতে আটকে রাখার উপায় হল, বারবার অনুশীলন করা”।

         হযরত আবু সাঈদ খুদরী রা. (মৃত্যু ৭৪ হি.) বলেছেন:
: ্র تحدثوا ، فإن الحديث يذكر بعضه بعضا. (شرف أصحاب الحديث للبغدادي)
“তোমরা বেশি বেশি হাদীস পড়ো, কেননা এক হাদীস অন্য হাদীস স্মরণ করিয়ে দেয়।”

         হযরত আলকামা রহ. (মৃত্যু ৮৬ হি.) বলেছেন:
أطيلوا ذكر الحديث حتى لا يدرس. (شرف أصحاب الحديث للبغدادي)
“তোমরা দীর্ঘ সময় হাদীসের আলোচনা করো, যেন বিস্মৃত হয়ে না যায়”। তাই তো দেখা যায়, মুহাদ্দিসীনে কেরাম একেক হাদীস বারবার পড়েছেন, অসংখ্য-অগণিত বার পড়েছেন।
 
         আবু ইসহাক সিরাজির রহ. (মৃত্যু ৪৭৬ হি.) ব্যাপারে বলা হয়।
وكان أبو إسحاق الشيرازي. يعيد الدرس مائة مرة. (من أسباب تراجع الدرس الحديثيّ)
“তিনি একটি সবক ১০০ বার পড়তেন।”

হযরত ইলকিয়া তবারী (মৃত্যু ৫০৪ হি.) সম্পর্কে বলা হয়েছে
كان إِلْكِيَا الطَّبَرِيُّ يعيد سبعين مرة. (من أسباب تراجع الدرس الحديثيّ)
“পূনরাবৃত্তি করতেন ৭০ বার।”
 
         হিস্স ইবনে আবি বকর নিসাপুরী রহ. বলছেন:
وقال الحس بن أبي بكر النيسابوري الفقيه: لا يحصل الحفظ إلي حتى يعاد خمسين مرة. (من أسباب تراجع الدرس الحديثيّ)
“কোন পড়া ৫০ বার না পড়লে আমার মুখস্থই হয় না।”

সৌদী আরবের মারকাযুল ফতওয়া থেকে হিফজুল হাদীসের নির্দেশনায় বলা হয়েছে:
وأما كيفية حفظ الحديث فبكثرة المطالعة وتكرار النظر، وقد كان جبل الحفظ يحيى بن معين وهو من هو في الضبط والاستحضار كان يكتب الحديث خمسين مرة ليضبطه في صدره.
(تَارِيخُ الْفَتْوَى.১০ ذو القعدة ১৪২৫ فتاوى الشبكة الإسلامية المفتي: مركز الفتوى بإشراف د.عبدالله الفقيه)
“হিফজুল হাদীসের পদ্ধতি হল, বেশি বেশি অধ্যয়ন ও বারবার নজর বুলানো। জাবালুল হিফজ ইয়াহইয়া ইবনে মাঈন রহ. (মৃত্যু ২৩৩ হি.) ছিলেন প্রচুর স্মৃতিশক্তিসম্পন্ন ব্যক্তি। তিনি একটি হাদীস ৫০ বার লিখতেন, যেন তা অন্তরে গেঁথে যায়।”

ইলম শিখার ক্ষেত্রে চিন্তা-চেতনা ও আগ্রহকে সব সময় জাগরুক রাখার অপরিহার্যতা বর্ণনা করতে গিয়ে হযরত আব্দুর রাজ্জাক রহ. (মৃত্যু ২৩৩ হি.) এক আজিব মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেছেন:
كُلُّ عِلْمٍ لَا يَدْخُلُ مَعَ صَاحِبِهِ الْحَمَّامَ فَلَا تَعُدَّهُ عِلْمًا. (الجامع لأخلاق الراوي وآداب السامع)
“যে ইলম তালিবে ইলমের সাথে সাথে টয়লেটে যায় না, সেটাকে ইলম মনে করো না।”

নির্বাচিত হাদীসগ্রন্থ ও পর্যায়ক্রম
এক বছরে হিফজুল হাদীসের পরিমাণ ও ধারাবাহিকতা কী হবে, তা সঠিকভাবে নির্বাচন করা একটি জটিল কাজ। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মেধা-যোগ্যতা ইত্যাদির তারতম্য বিবেচনা করলে বিষয়টি আরো জটিল হয়ে উঠে। তা সত্তে¡ও একটি পথ তো অবশ্যই বের করতে হবে। সে জন্য কয়েকটি মূলনীতি সামনে রাখা হয়েছে।

১. হাদীসগুলো হবে বিষয়ভিত্তিক এবং বহুল আলোচিত ইখতিলাফি বিষয়সমূহে পক্ষ-বিপক্ষের           উল্লেখযোগ্য দলিলাদি।
২. পরিমাণ হবে শিক্ষার্থীদের মেধাগত তারতম্য বিবেচনায় মধ্যম পর্যায়ের।
৩. পর্যায়ক্রম ও ধারাবাহিকতা হবে যথাসম্ভব ছোট থেকে বড় হাদীস।
৪. অনুবাদ জটিলতায় সময় বাঁচাতে হাদীসগুলো হবে বাংলা অনুবাদসহ।

এই মূলনীতিগুলোর উপর ভিত্তি করে একদম প্রাথমিক ও প্রস্তুতিমূলক একটি তালিকা তৈরী করা হয়েছে। বড়দের নির্দেশনা ও পরামর্শে সেটি আরো সুবিন্যস্ত ও উপযোগী করার প্রক্রিয়া চলমান। ইনশাআল্লাহ!


হিফ্জুল হাদীসের কাঙ্খিত পরিমাণ
 হিফজুল হাদীসের পরিমাণের ক্ষেত্রে ইমাম জুহরীর রহ. (মৃত্যু ১২৪ হি.) বক্তব্য হল:
من طلب العلم جملة فاته جملة، وإنما يدرك العلم حديث وحديثان.
(من أسباب تراجع الدرس الحديثيّ)
“যে একত্রে সব শিখে ফেলে, সে একত্রে সব হারিয়ে ফেলে। বস্তত এক হাদীস-দুই হাদীস শিখার মাধ্যমেই (ধীরে ধীরে) ইলম অর্জন হতে থাকে।”

         তাই হাদীসের সংখ্যাগত পরিমাণের চেয়ে মুখস্তের স্থায়িত্বের জন্য বেশি বেশি তামরীনের গুরুত্ব দেয়া হবে। এক বছরে নামে মাত্র অসংখ্য হাদীস মুখস্থ না করিয়ে, বরং একেকটি হাদীস অসংখ্যবার তামরীন বা অনুশীলন করানোর চেষ্টা করা হবে।

তা সত্তে¡ও সার্বিক দিক বিবেচনা করে অর্থ বুঝার যোগ্য, এমন স্তরের মেধাবী ছাত্রদের জন্য একটি যৌক্তিক ও সাধ্যের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হবে। তা হলো, অর্থসহ পবিত্র কুরআনের ১০ পারা সমপরিমাণ। স্বাভাবিকভাবে এ পরিমাণটা বেশি হওয়ার কথা নয় এবং এক বছরে একদম কমও নয়। অবশ্য স্মৃতিশক্তির তারতম্য বিবেচনায় একাধিক গ্রæপ থাকবে এবং গ্রæপ ভিত্তিক পরিমাণও নির্ধারণ করা হবে। হাদীসগুলো বিষয়ভিত্তিক ধারাবাহিকাতায় অর্থসহ মুখস্থ করানো হবে। প্রথম দিকে ছোট ছোট হাদীস, এরপর ধীরে ধীরে মাঝারি ও বড় বড় হাদীস মুখস্থ করার অভ্যাস গড়ে তোলার চেষ্টা করা হবে। দিন, সপ্তাহ, মাস ও হাদীস সংখ্যার ভারসাম্যতা ঠিক রেখে বর্ষপরিকল্পনায় সময়ের সর্বোচ্চ ব্যবহার করার চেষ্টা করা হবে। হিসাব সংরক্ষণ করার জন্য থাকবে তথ্যবইও । ইনশাআল্লাহ!

         ইমাম জুহরী রহ. (মৃত্যু ১২৪ হি.) আরো বলেন:
إن هذا العلم إن أخذته بالمكاثرة له غلبك، ولكن خذه مع الأيام والليالي أخذاً رفيقاً تظفر به. (من أسباب تراجع الدرس الحديثيّ)
“ইলম যদি (একত্রে) অনেক বেশি অর্জন করো, তাহলে আয়ত্ব রাখতে পারবে না। তবে  যদি অনেক দিন-অনেক রাত ব্যাপী ধীরে ধীরে শিখো, তাহলে এর মাধ্যমে তুমি হবে ভাগ্যবান ।”

হিফ্জুল হাদীস : বয়স ও যোগ্যতা
যদিও মুখস্থের সুনির্দিষ্ট কোন বয়স নেই, বয়স্ক ও প্রবীণদের অনেকেই প্রমাণ করেছেন পূর্ণবয়স্ক হয়েও প্রবল ইচ্ছা থাকলে হিফজ করা যায়, তবুও মুহাদ্দিসীনে কেরাম শৈশব ও তারুণ্যকেই হিফ্জের অধিক উপযুক্ত ও স্বাভাবিক সময় মনে করতেন।

হযরত হাসান বসরী রহ. (মৃত্যু ১১০ হি.)  বলেছেন:
طلب الحديث في الصغر كالنقش في الحجر .(جامع بيان العلم وفضله، جـ১ صـ৮২)
“শৈশবে হাদীস শিক্ষা করা, পাথরে খোদাই করার মত”।

মুকসিরীনে হাদীস সাহাবীদের রাযি. প্রায় সবাই তো কৈশোর ও তারুণ্যেই হাদীস মুখস্থ করেছেন।  (الحديث والمحدثون صـ১১৭-১২৮)।

ইমাম বুখারী রহ. (মৃত্যু ২৫৬ হি.)  নিজেই বলেছেন:
فلما  طعنت في  ست عشرة سنة حفظت كتب ابن المبارك ووكيع
(الحديث والمحدثون صـ২৯৬)
“আমি যখন মাত্র ১৬ বছর বয়সে (তারুণ্যে) উপনীত, তখনই আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক (মৃত্যু ১৮১ হি.) ও ওয়াকি রহ. (মৃত্যু ১৯৭ হি.) কর্তৃক সংকলিত হাদীসের কিতাবগুলো মুখস্থ করে ফেলেছি”।

শৈশবে কুরআন-সুন্নাহ শিক্ষার গুরুত্বের ব্যাপারে আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি. (মৃত্যু ৬৮ হি.) এর আজাদকৃত গোলাম ইকরামা রহ. (মৃত্যু ১০৮ হি.) নিজের সম্পর্কেই বলেছেন:
كان ابن عباس يضع الكبل في رجلي على تعليم القرآن والسنة. (تذكرة الحفاظ، جـ১صـ৯০)
“ইবনে আব্বাস রাযি. কুরআন-হাদীস শিখানোর জন্য আমার পায়ে শিকল পরিয়ে রাখতেন।”

আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাযি. (মৃত্যু ৩২ হি.)- এর বিশিষ্ট ছাত্র হযরত আলকামা রহ. (মৃত্যু ৮৬ হি.) যৌবনকালে মুখস্থকৃত ইলমের ব্যাপারে বলেছেন:
ما حفظت وأنا شاب فكأني أنظر إليه في قرطاس أو ورقة.
(جامع بيان العلم وفضله، جـ১ صـ৮২)
“যৌবনে মুখস্থ করা বিষয়গুলো যেন এখনো আমার চোখে ভাসছে।”

হযরত মা’মার রহ. (মৃত্যু ১৫৪ হি.) বলেছেন কৈশোরের কথা:
جالست قتادة وأنا ابن أربع عشرة سنة، فما سمعت منه شيئا وأنا في ذلك السن إلا وكأنه مكتوب في صدري (قيمة الزمن عند العلماء صـ২৩৪)
“আমি ১৪ বছর বয়সেই কাতাদার রহ. (মৃত্যু ১১৮ হি.) মজলিসে বসতাম, সে বয়সে যা কিছু মুখস্থ করতাম, তাই যেন আমার হৃদয়ে বইয়ের মত লিখিত হয়ে যেত”।

হযরত আবু হুরায়রা রাযি. (মৃত্যু ৫৯ হি.) তো ভর যৌবনেই (২৮-৩২ বছরের মধ্যে) পাঁচসহ¯্রাধিক হাদীস মুখস্থের দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করেছেন (الحديث والمحدثون صـ১১৭-১১৯)। মুহাদ্দিসগণ এভাবেই যৌবন ও তারুণ্যে হিফ্জুল হাদীসের চর্চা করেছেন, হাজার হাজার হাদীস মুখস্থ করে ধন্য হয়েছেন এবং উত্তরসূরীদের জন্য দৃষ্টান্ত পেশ করে গিয়েছেন।

উপরিউক্ত আলোচনা, বর্তমান প্রেক্ষাপট, তালিবানে ইলমের ইসতি’দাদ, পারিপাশির্^ক অবস্থা ইত্যাদি বিবেচনা করে এক বছর মেয়াদী ‘হিফজুল কুরআনের আলোকে হিফজুল হাদীস’ এর ক্ষেত্রে তালিবানে ইলমের জন্য নির্ধারিত মৌলিক যোগ্যতা হল, দরসে নেজামির সর্বনি¤œ শরহে বেকায়া, মাদানী নেসাবে ৪র্থ বর্ষ, আলিয়া নেসাবে ফাযিল পড়–য়া বা উপরের যে কোন স্তরে বা জামাতে পড়া। তবে আরবি থেকে অনুদিত যে কোন লেখা নসের সাথে মিলিয়ে পড়তে পারা নূন্যতম মৌলিক যোগ্যতা। ইলমী যোগ্যতার পাশাপাশি মেহনতের যোগ্যতাও জরুরী। সময়ের কোন মুহাক্কিক হাদীস বিশারদ হিম্মতের বাণী শুনিয়েছেন: “এ ক্ষেত্রে (হিফজুল হাদীস) মূল বিষয় হচ্ছে; চর্চা ও অনুশীলন, শুধু স্মরণশক্তিই যথেষ্ট নয়”।


দৈনন্দিন রুটিনে মৌলিক কাজসমূহ
১. সবক: হিফজুল কুরআনের নিয়মে মাগরীব হতে এশা পর্যন্ত আবশ্যকীয়ভাবে নতুন সবক মুখস্থ করা। ভোরে জাগ্রত হওয়ার পর নির্ভুলভাবে উস্তাদকে শোনানো। স্বাভাবিকভাবে দৈনন্দিন হাদীস মুখস্থের সর্বনি¤œ পরিমাণ প্রচলিত হাফেজী কুরআনের ১ পৃষ্ঠা সমপরিমান বা ১৫ লাইন।

২. সাত সবক: প্রতিদিন নাস্তার পূর্বে নতুন সবকের পূর্ববর্তী ৪ দিনের পুরনো সবক হিফজুল কুরআনের মত সাত সবক হিসাবে বাধ্যতামূলকভাবে উস্তাদকে শোনানো।

৩. ইয়া’দাহ্ বা পূন:পাঠ: প্রতিদিন সাত সবক শোনানোর পর; অন্তত ৯০ মিনিট ব্যাপী পেছনের মুখস্থকৃত হাদীসগুলো তারতীব অনুযায়ী নিজে নিজে পড়া।

৪. তারমীন: হিফজুল কুরআনে আমুখতার জন্য যে সময়টা নির্ধারিত, সে সময়টাতে অন্তত ৯০ মিনিট গ্রæপভিত্তিক তামরীন করা।

৫. মুরাজাআ’ত: প্রতিদিন আসরের আজানের পূর্বে ১ ঘন্টা ব্যাপী মুখস্তকৃত নতুন হাদীসগুলো মূল কিতাব থেকে মুরাজাআ’ত করার চেষ্টা করা। তবে এ মুরাজাআ’ত কোন হাদীসের হুকুমের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দেয়ার জন্য নয়। শুধুমাত্র হাদীসের মৌলিক কিতাবাদির সাথে সম্পর্ক তৈরীর জন্য। বস্তুত: উলূমুল হাদীসের যোগ্যতা আর হিফজুল হাদীসের যোগ্যতা দুটি ভিন্ন ভিন্ন বিষয়। একটি অপরটি বিকল্প নয়। সহযোগী হতে পারে মাত্র।

৬. হাদীস বিষয়ক রোজনামচা: দৈনন্দিন মুখস্তকৃত হাদীসগুলো থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা, উপলব্ধি, আদব-আখলাক, সমাজ ও যুগের সাথে হাদীসের সাদৃশ্য-বৈসাদৃশ্য, জাগতিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের সাথে মিল-অমিল, হাদীস মুখস্তের ক্ষেত্রে সহজতা-জটিলতা, হাদীসের সাথে নিজের আমলের যাচাই-বাছাই ইত্যাদি বিষয়ে নিজস্ব যোগ্যতায় বাধ্যতামূলকভাবে রোজনামচা লেখা। রোজনামচা লেখার সময় নির্ধারিত হবে প্রত্যেকের নিজের মত, তবে রুটিনের অন্যান্য কাজে যেন ব্যঘাত না ঘটে, সে ক্ষেত্রে পূর্ণ সচেতন থাকতে হবে। রুটিননির্ভর এ রোজনামচা হবে হাদীস বিষয়ে মেধাশক্তি ও অনুধাবনশক্তি চর্চার জন্য প্রচেষ্টা স্বরুপ। এ সকল রোজনামচা সিদ্ধান্তমূলক লেখা হিসাবে গণ্য হবে না।

৭. মনোন্নয়নের হার: দৈনন্দিনের কাজগুলো রুটিন অনুযায়ী সম্পাদিত হয়েছে কিনা, সে জন্য প্রতি রাতে ঘুমের ১৫ মিনিট পূর্বে তত্ত¡াবধায়ককে তথ্যবই দেখিয়ে মনোন্নয়নের হার বা মন্তব্য লিখে নেয়া। তত্ত¡বধায়কের পরামর্শে নতুন হাদীস মুখস্থের পরিমাণ বাড়ানো বা কমানো যাবে, নিজের মনমত নয়। তত্ত¡াবধায়কের পরামর্শ ব্যতীত হিফজুল হাদীস ছাড়া অন্য যে কোন বিষয়ে পড়াশোনা করা রুটিন পরিপন্থি কাজ বলে বিবেচিত হবে।

৮. সাপ্তাহিক তামরীন: এটা মূলত সাপ্তাহিক সবিনার মতই। তবে তা হবে তামরীন আকারে। সাপ্তাহিক তামরীন বৃহস্পতিবার মাগরীবের পর হতে শুক্রবার সকাল ৮ টা পর্যন্ত। সাপ্তাহিক তামরীন শেষে তত্ত¡াবধায়ককে তথ্যবই দেখিয়ে, সে ব্যাপারে তার পর্যালোচনা শোনা এবং সে আলোকে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা।

৯. ঘুমের সময়: সুস্থতা ও ব্রেণের ধীর-স্থিরতার জন্য ঘুমের নির্ধারিত সময়গুলোতে আবশ্যকীয়ভাবে ঘুমানো।
 









পরিশিষ্ট
দলীল উল্লেখের চেয়ে মুখস্থ রাখাটাই বেশি জরুরী
“মাসআলার সাথে দলীল বা দলীলের নস উল্লেখ করা সর্বক্ষেত্রে জরুরী নয়। তেমনি ওয়াজ-নসীহতেও আয়াত ও হাদীসের উদ্ধৃতি সর্বদা অপরিহার্য নয়। সর্বাবস্থায় যা জরুরী তা হল, মাসআলা সহীহ হওয়া এবং ওয়াজ নসীহত ‘ওয়াজ’ ও ‘নসীহত’ হওয়া। সালাফের ফকীহগণের ফতোয়া ও মুসলিহ-সংস্কারকদের ওয়াজ-নসীহত সনদসহ সংরক্ষিত আছে। তাঁরা ফতোয়া বা ওয়াজে সর্বদা দলীল ও হওয়ালা উল্লেখ করা জরুরী মনে করতেন না। যদিও হাওয়ালা ও দলীল তাদের জানা ছিল এবং অধিকাংশ দলীল, বিশেষত প্রসিদ্ধ মাসআলার দলীলসমূহের মূল পাঠও কন্ঠস্থ ছিল। প্রয়োজনের সময় তারা তা পেশ করতেন।

সুতরাং ‘ওয়াজ ও মাসআলায় সাধারণ অবস্থায় দলীল বলার প্রয়োজন হয় না’- এই কথাটিকে দলীল না-জানা বা জরুরী দলীল মুখস্থ না রাখার অজুহাত তাঁরা বানান নি। পক্ষান্তরে আমরা একে অযুহাত বানিয়েছি। ফলে সালাফ ও আকাবিরের পথ থেকে আমরা সরে যাচ্ছি। অথচ তাঁদের তুলনায় দলীল মুখস্থ করার প্রয়োজন আমাদের অনেক বেশি। কারণ, ইলম ও তাকওয়ায় সালাফের মাকাম এত উঁচু ছিল যে, তাঁদের কথা ও কাজ ছিল শরীয়তেরই তরজুমান-প্রতিচ্ছবি। ফলে তাঁদের প্রতি মানুষের পূর্ণ আস্থা ছিল।" (মাকতাবাতুল আশরাফ থেকে প্রকাশিত ‘হাদীসের আলো’ কিতাবের ভুমিকা। মাওলানা আব্দুল মালেক হাফিজাহুল্লাহ)

ফিক্হ ও হাদীস

ফিক্হ একজন মুসলিমের জীবন চলার পথে সহজ পাথেয়, কিন্তু এ কথাও সবার কাছে স্বীকৃত, ফিক্হের উৎস কুরআন ও হাদীস। সুতরাং হাদীস হল দলিল, ফিক্হ হল মাদলূল। ফিক্হ হল দাবী, আর হাদীস হল দলিল। এখানে কোন্টা থেকে কোন্টা কম গুরুত্বের? সুতরাং কোন কোন ক্ষেত্রে শুধু মাসআলা বর্ণনা করা যথেষ্ট হলেও, তার দলিল অবশ্যই জানা থাকতে হবে। এটাই যৌক্তিক। হয়ত দলিল দিয়ে নতুন কোন মাসআলা উদ্ভাবন করার যোগ্যতা বা সুযোগ কারো আছে কিনা, সেটা বিবেচনার বিষয় হতে পারে।

কিন্তু যে সব মাসআলা উদ্ভাবিত হয়ে গেছে, সেগুলোর দলিল তো অবশ্যই সংরক্ষিত আছে, সেগুলো জানা থাকতে হবে না? দলিল সিন্ধুকে সযতেœ রেখে দিয়ে জমির মালিকানা দাবী করা হল, কিন্তু সময় মত আদালতে পেশ করা হল না, এমনটা কি কোন বুদ্ধিমান মেনে নিবে? একজন মুসলিমের জন্য, বিশেষ করে নববী ওরাছাতের হকদারের জন্য কি ফিক্হের দলিলগুলো জানার প্রয়োজন নেই? আশা করা যায়,  এতে কারো দ্বিমত থাকার কথা না।

শাহ ওয়ালি উল্লাহ মুহাদ্দেসে দেহলবী রহ. (মৃত্যু ১১৭৬ হি.) বলেন:
دائما تفريعات فقهيه را بر كتاب وسنت عرض نمودن. ) تدوين فقه  أور جند اهم فقهي مباحث(
“ফিকহী মাসআলাগুলোকে সবসময় কুরআন ও হাদীসের সঙ্গে মিলিয়ে পড়া দরকার”।

সুতরাং ফিক্হসহ সব ধরণের শরয়ী বিষয়ে দলিল মুখস্থ থাকা জরুরী। এমনকি ফিক্হ বিন্যাস্ত হয়ে যাওয়া এবং হাদীসসমূহ লিখিত হয়ে যাওয়ার কারণে হিফজুল হাদীসের প্রয়োজনীয়তাকেও খাটো করে দেখার সুযোগ নেই।

‘আলমাদখালে’র একটি উদ্বৃত্তি থেকে বুঝা যায়
إنّ جـميع علوم الشريعة قد دوّنت فيها الدواوين، وصنّفت فيها التصانبيف، ومن ذلك العلوم ما قد فاق في ذلك علوم الحديث تفوقا كبيرا، فمقتضى منطقكم أنتم أنّ الناس الآن في غنية عن جـميع العلوم، وأنـهم لاتـحتاجون إلى تـحصيلها، وهذا أظهر من أن يـخفى بطلانه.- المدخل إلى علوم الحديث الشريف- )بقلم محمد عبد المالك صـ২২)
‘কোন শাস্ত্র লিখিত হয়ে গেলেই, কিতাবাদিতে সংরক্ষতি হয়ে গেলেই তার চর্চা থেমে যেতে পারে না। যদি এটা যৌক্তিক হতো, তাহলে সকল শাস্ত্রই তো বর্তমানে লিখিত ও সংরক্ষিত আছে, সুতরাং এ কালের মানুষের জন্য সে সকল জ্ঞান-শাস্ত্র চর্চা করার কোন প্রয়োজন হতো না”

হিফজুল হাদীসের এক বছর : দরস গ্রহণে বিচ্ছিন্নতা নয়, দৃঢ়তা
‘দাওরা পড়ার পূর্বে হিফজুল হাদীসের জন্য ১ বছর সময় দেয়া মানে পূর্বাপর জামাত দুটির মাঝে বিচ্ছিন্নতা’- নয়। কারণ, আমাদের সব পড়া-লেখার লক্ষ্যই তো সরাসরি কোরআন-হাদীস। আর হিফজুল হাদীস তো হাদীসের নিকটতম হওয়ার সরাসরি ও কার্যকরি মাধ্যম। তাফসীর, ফেকাহ্ ও র্শাহে হাদীসের দরসগুলো হৃদয়ঙ্গম করার পূর্বে ‘হাদীস’ মুখস্থ থাকলে কি দরসগুলো আরো শানদার হবে না? শরাহের আগে মতনের গুরুত্ব কি কোন অংশে কম? হিফজুল হাদীসের কারণে অন্যান্য ‘ফনে’র ধারাবাহিকতা রক্ষা হবে না, তাও হতে পারে না। বরং যে কোন ফনের ক্ষেত্রে হিফজুল হাদীস শক্তিশালী সহায়কের ভূমিকা রাখবে। এর কারণ ও যুক্তিগুলো যে কোন ইলমী ব্যক্তি চিন্তা করলেই বুঝতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে ইমাম শাফেয়ীর রহ. (মৃত্যু ২০৪ হি.) বক্তব্যটি লক্ষ্যনীয়। তিনি বলেছেন:
من حفظ الحديث قويت حجته. (الديباج المذهب في معرفة أعيان المذهب)
“যে ব্যক্তি হাদীস মুখস্থ করবে, তাঁর দলিলই শক্তিশালী হবে।”
দলিলাদি মুখস্থের সময় কখন? যখন অর্থ-মর্ম বুঝার যোগ্যতা থাকে না, তখন? ফারেগের পরে যখন মেহনতের ইচ্ছা থাকলেও সময়-সুযোগ থাকে না, তখন? আসলে কখন?

আমাদের দারসে মিশকাত ও দারসে দাওরার নেসাব ও পদ্ধতি অনুযায়ী কি হাদীস মুখস্থ করার মতো পর্যাপ্ত সময়-সুযোগ থাকে? প্রবল আগ্রহ ও তুখোর মেধা ছাড়া কি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ হাদীস মুখস্থ করা সম্ভব? এ ক্ষেত্রে শায়খ মুহাম্মদ আওয়ামা হাফিজাহুল্লাহুর অনুভ‚তিটি অনুভব করার মতো। তিনি বলেছেন: “আমি যতটুকু জেনেছি, বাংলাদেশে মাদারেসে দ্বীনিয়াতে অনেক হাদীসের কিতাব পড়ানো হয়, তাই নয় কি? আমরা (সম্মুখ শ্রোতাগণ) উত্তরে বললাম, জ্বী, অবশ্যই। তিনি সাথে সাথেই প্রশ্ন করলেন, তালিবুল ইলমরা এসব কিতাব থেকে কয়টি হাদীস মুখস্থ করে? তালিবুল ইলম এসব হাদীসের কিতাব পড়বে, অথচ একটি হাদীসও হিফ্জ করবে না- এটা বড় দুঃখজনক। তিনি বলেন: হিফ্জুল হাদীস ওয়াল আছার খুবই জরুরী। ..”। মাসিক আল কাউসার, সফর ১৪৪০ হিজরী।

তাছাড়া হিফজুল হাদীসের রুটিনে ‘রোজনামচা’ পর্বটি একটি আত্মোন্নয়নমূলক পর্ব; এটি হাদীসের ক্ষেত্রে নিজস্ব যোগ্যতা, মেধা, বুদ্ধি ও গবেষণায় আগ্রহ সৃষ্টির প্রচেষ্টা। এর মাধ্যমে জানা সকল ইলমেরই চর্চা হতে পারে। এককথায় হিফজুল হাদীসের এই ‘একটি বছর’ যেন পূর্বের জানা ইলমগুলোকে শক্তিশালি করা এবং পরবর্তী বছরগুলোর প্রস্তুতি নেয়ার বছর। আল্লাহ যদি সহায় হোন।


মানুষের স্বভাবই তো ভুলে যাওয়া, তবে স্থায়িত্বের জন্য চর্চা আবশ্যক
মুখস্থ করার আগেই কি ভুলে যাওয়া সম্ভব? ভুলার পূর্বশর্তই তো হল, মুখস্থ করা। তবে মুখস্থের স্থায়িত্বের জন্য জরুরী হল, চর্চা ও অনুশীলন অব্যাহত রাখা এবং এটা যে কোন বিষয়ের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। অবশ্য প্রথমে যখন কোন পড়া মুখস্থ করা হবে, তখন যদি ভালোভাবে মুখস্থ করা হয়, তাহলে পরবর্তীতে ভুলে গেলেও সামান্য নজর বুলালেই তা স্মরণ হয়ে যাওয়ার আশা করা যায়। ইন্শাআল্লাহ! আর যদি প্রথমে ভালোভাবে মুখস্থ করা না হয়, তাহলে এ উপকারিতাটাও অসম্ভব। যেমনটা লক্ষ করা যায় হাফেজে কুরআনদের ক্ষেত্রে।

সুতরাং এক বছর মেয়াদে হিফজুল হাদীসে সময় দেয়ার মাধ্যমে অন্তত এতটুকু আশা তো অবশ্যই করা যায় যে, এখন হাদীসগুলো ভালোভাবে মুখস্থ করে রাখলে ভবিষ্যতে ভুলে গেলেও দু’একবার নজর বুলানোর মাধ্যমে তা আবার স্মরণে চলে আসবে। ইনশাআল্লাহ! আর হিফজুল হাদীসে উদাসীনতার এ যুগে এতটুকু ফায়দাও কি কম?

ভূমিকাটি এখানে
ক.
সকল শোকর ও প্রশংসা একমাত্র আল্লাহর জন্য। অগণিত দুরুদ ও সালাম রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর প্রতি এবং তাঁর অনুসারী পূর্বাপরের সকল মুমিনের প্রতি। সকল কাজে ভরসা একমাত্র আল্লাহ্ তায়া’লাই।

খ.
‘হিফজুল কুরআনের আলোকে হিফজুল হাদীস’-এ ‘পদ্ধতি’ সম্পর্কে ভূমিকায় কিছু বলাই বাহুল্য। বইটির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত রয়েছে। অবগতির জন্য ধৈর্যসহকারে পূর্ণটা পড়া ছাড়া বিকল্প নেই। .وماتوفيقي إلابالله.।

গ.
দীর্ঘ ৬ বছরের অধ্যয়ন, চিন্তা-ফিকির ও গবেষণা। ১ মাস ব্যাপী ১১ জন তালিবে ইলমের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ। দীর্ঘ ৯ মাস যাবত ৬ জন তালিবে ইলমের মাধ্যমে ‘হিফজুল কুরআনের আলোকে হিফজুল হাদীস’ পদ্ধতিটির প্রায়োগিক পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা। অবশেষে বর্তমান কাঠামো। তা সত্তে¡ও যোগ্যতাসম্পন্ন যে কোন ব্যক্তির কাছে এর ভালো-মন্দ যে কোন দিক নজরে আসতে পারে, এবং এটাই স্বাভাবিক। চিন্তাশীল যে কারো সুচিন্তিত মতামতকে শ্রদ্ধার সাথে গ্রহণ করা হবে। ইন্শাআল্লাহ!

ঘ.
‘হিফজুল হাদীসে’র বহু পদ্ধতি থাকতে পারে। ‘হিফজুল কুরআনের আলোকে হিফজুল হাদীস’ জানা-অজানা বহু পদ্ধতির একটি মাত্র পদ্ধতি। সুতরাং এটি পছন্দ-অপছন্দও যার যার আকল ও রুচি নির্ভর। এটি গ্রহণ করা বা না করার ক্ষেত্রেও কেউ বাধ্য নয়। যার কাছে ভালো মনে হবে, অবলম্বন করবে। যার ভালো লাগবে না, করবে না। বস্তত; সবার জন্য সব জরুরীও নয়। তবে আশা করা যায়, এতটুকু বিশ^াস অতিরঞ্জন হবে না, হিফজুল হাদীসের জানা-শোনা পদ্ধতিসমূহের মাঝে ‘হিফজুল কুরআনের আলোকে হিফজুল হাদীস’ পদ্ধতিটি সালাফের জীবনী নির্ভর, পরিকল্পিত,  সুবিন্যস্ত। এমনকি মেয়াদ ও লক্ষ্যভিত্তিক। পাশাপাশি প্রচুর তামরীন ও অনুশীলন বিশিষ্ট। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার এ যুগে ‘প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনা’তেই পরিচালিত।

ঙ.
জ্ঞানীগণ বলে থাকেন: ‘সাধারণত সৃজনশীল কর্ম-পদ্ধতির ক্ষেত্রে যৌক্তিক-অযৌক্তিক বহু আপত্তি-অভিযোগ, ভুল বুঝাবুঝি ও অন্তরায় দৃশ্যমান হয়ে ওঠে’। এ ক্ষেত্রে সূরা হুজুরাতের ১২ নং আয়াত ও সূরা ক্বফের ১৮ নং আয়াতই সবচেয়ে বড় হেদায়াত।
        আল্লাহ তায়া’লা বলেন:
يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اجْتَنِبُوا كَثِيرًا مِنَ الظَّنِّ إِنَّ بَعْضَ الظَّنِّ إِثْمٌ وَلَا تَجَسَّسُوا وَلَا يَغْتَبْ بَعْضُكُمْ بَعْضًا أَيُحِبُّ أَحَدُكُمْ أَنْ يَأْكُلَ لَحْمَ أَخِيهِ مَيْتًا فَكَرِهْتُمُوهُ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ تَوَّابٌ رَحِيمٌ.
سورة الحجرات:  (১২)
مَا يَلْفِظُ مِنْ قَوْلٍ إِلَّا لَدَيْهِ رَقِيبٌ عَتِيدٌ. سورة ق: (১৮)

চ.
‘হিফজুল কুরআনের আলোকে হিফজুল হাদীস’- এটি শরয়ী কোন হুকুম বা আমল নয়। আশা করা যায়, এ ক্ষেত্রে ছোট-খাটো অসঙ্গতি গোমরাহির প্রমাণ বহন করবে না। ভুল-ত্রæটি হলে অবশ্যই সংশোধনযোগ্য। অতএব যে কারো পরামর্শ সাদরে গ্রহণ করা হবে। ইনশাআল্লাহ!

ছ.
বিভিন্ন ক্ষেত্রে আলোচ্য আরবি উদ্ধিৃত্তিগুলোর অনুবাদে সুনির্দিষ্ট কোন ধারা অনুসরণ করা হয় নি। বরং লেখা ও বিষয়ের পূর্বাপরের গতিময়তা ও সাবলীলতা রক্ষা করার জন্য; অবস্থাভেদে শাব্দিক অনুবাদ, ভাবানুবাদ ও ছায়া অনুবাদ সবগুলোই অনুসরণ করা হয়েছে। অনুবাদের ক্ষেত্রে বিষয়ের গুরুত্বটাই প্রধান হিসাবে বিবেচনা করা হয়েছে। তাই মূল লেখা কিংবা অনূদিত লেখা; কোনটাই সাহিত্য বিবেচনাযোগ্য নয়। বানানের ক্ষেত্রেও অসঙ্গতি থাকতে পারে, পরবর্তীতে সংশোধন করে নেয়া হবে। ইনশাআল্লাহ!

জ.
‘হিফজুল কুরআনের আলোকে হিফজুল হাদীস’- এ পরিকল্পনার মাধ্যমে ওয়ারাছাতুল আম্বিয়াকে চাঁদের দেশে নিয়ে যাওয়ার আকাশ কুসুম কল্পনা করা হয়নি, কিংবা সাগর সেচে মুক্তা আনার অসাধ্য স্বপ্নও দেখানো হয়নি। শুধু পরিকল্পনা করা হয়েছে, মুহাদ্দিসীনে কিরামের রেখে যাওয়া মিরাছ, হিফ্জুল হাদীসের ভূমিতে, মেহনত-মুজাহাদার সার-পানি দিয়ে একটু নতুন করে চাষাবাদ করতে, ওয়ারাছাতুল আম্বিয়া প্রজন্মের হাতে সেই চাষাবাদের কিছু ফসল ‘হাদীসে নববীর হিস্যা’ তুলে দিতে এবং হিফ্জুল হাদীসের জগতে গাফলতের অমানিশা কাটিয়ে একটি নতুন ভোরের জানান দিতে। আল্লাহই উত্তম সহায়।

ঝ.
কোন মহৎ কাজের উদ্যোগ যেন হিতে বিপরীত না হয়ে যায়, সে জন্য সর্বোচ্চ সতর্কতা জরুরী। বিশেষ করে এ যুগে সেটা আরো বেশি প্রয়োজন। সে সব বিবেচনায় ‘হিফজুল কুরআনের আলোকে হিফজুল হাদীস’ নামক ‘বইটি’ এবং এ ‘পদ্ধতিটি’ও মেধাস্বত্ত¡ বিধি-নিষেধের আওতায় পড়বে। বিষয়টি অবগত থাকা ভালো।
 

আলহামদুলিল্লাহ! ‘হিফজুল কুরআনের আলোকে হিফজুল হাদীস’ বাস্তবায়নে অনেকেরই সমর্থন ও সহযোগিতা রয়েছে। নাম বলে কাউকে খাটো করা উচিত মনে হচ্ছে না। বস্তুত নাম বা সম্পর্কের ভিত্তিতে নয়, কাজের প্রয়োজনীয়তা ও উপযোগিতাই হোক সবার কাছে বিবেচ্য বিষয়, সেটাই তো বড়দের শিক্ষা ও মূল চেতনা। সকল সহযোগী-শুভাকাঙ্খীর জন্য শুভকামনা। আল্লাহ সবার সহায় হোন। সবাইকেই কবুল করুন। আমীন।





শিক্ষার্থীদের সংক্ষিপ্ত অনুভূতি
‘হিফজুল কুরআনের আলোকে হিফজুল হাদীস’ পদ্ধতিটি ফলপ্রসু হওয়ার জন্য, প্রস্তাবক হিসাবে শুধু একজনের চিন্তা-পরিকল্পনাই যথেষ্ট হতে পারে না। এ জন্য প্রয়োজন বিশেষজ্ঞগণের পরামর্শ, দিক-নির্দেশনা।
পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মতামতও কম গুরুত্বের নয়। যেহেতু পদ্ধতিটির কার্যকরি প্রয়োগ তাদের উপরই হয়েছে এবং হচ্ছে। দীর্ঘ দিন যাবত তারাই ‘হিফজুল কুরআনের আলোকে হিফজুল হাদীস’ পদ্ধতি ও রুটিন অনুযায়ী মেহনত করেছেন।

শিক্ষার্থীদের সংক্ষিপ্ত অনুভূতিগুলো-
    “আলহামদুলিল্লাহ! ‘হিফজুল কুরআনের আলোকে হিফজুল হাদীস’- কোর্সে ভর্তি হতে পেরে নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে হচ্ছে। যদিও প্রথমদিকে এর ফায়দা সম্পর্কে দ্বিধা-দ্বন্ধে ছিলাম, কিন্তু এখন অনেক উপকারি ও গুরুত্বপূর্ণ মনে হচ্ছে”।
- শামিম আহমদ, ‘শরহে বেকায়া’ পড়েছেন।

    “আলহামদুলিল্লাহ! ‘হিফজুল কুরআনের আলোকে হিফজুল হাদীস’- এর এই মেহনতে অংশ নিয়ে আশাতীত ফল পাচ্ছি। হাদীসের মতন রাবির নাম ও মূল কিতাবের নামসহ মুখস্থ করে ইয়াদ রাখা যে সম্ভব, সেটায় আশ্বস্ত হচ্ছি এবং এই মেহনতের ফলে ‘হিফজুল হাদীস’-এর মেজাজ ও রুচি এবং মনে রাখতে পারার আত্মবিশ্বাসও অর্জন হয়েছে”।
- যাকারিয়া মাহমুদ, ‘মেশকাত’ পড়েছেন।

    “হাদীস আগেও মুখস্থ করতাম, এখনো করি, তবে উভয়ের মাঝে অনেক পার্থক্য। তখন হাদীস মুখস্থ করলে মনে হত, ভুলে যাবো। আর এখন এই আত্মবিশ্বাস জন্মেছে যে, আর ভুলবো না”।
- নাঈম হাসান, ‘শরহে বেকায়া’ পড়েছেন।

    “হাদীস মুখস্থের প্রয়োজনীয়তা এবং পরিমাণ ও পদ্ধতি বিবেচনা করে ‘হিফজুল হাদীস’- এর এই মেহনতে অংশ গ্রহণ করেছি। রুটিন অনুযায়ী তামরীন করে এবং রোজনামচা লিখে খুব উপকৃত ও মুগ্ধ হচ্ছি”।
- সালাহুদ্দিন সাঈদ, ‘মেশকাত’ পড়েছেন।

    “কোন কাজ না করলে কিংবা না দেখলে বুঝা যায় না যে, কাজটি করা সম্ভব না অসম্ভব? ‘হিফজুল কুরআনের আলোকে হিফজুল হাদীস’- এর এই মেহনত আমার কাছে তেমনই মনে হয়েছে। এতে অংশ নিয়ে বুঝতে পেরেছি, হাদীস মুখস্থের স্থায়িত্বের জন্য এটি একটি ফলপ্রসু মাধ্যম”।
- ইউনুস গাজী, ‘মেশকাত’ পড়েছেন।

    “আলহামদুলিল্লাহ! মুখস্থকৃত হাদীসগুলো থেকে যে কোন বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে, সে বিষয়ে মূল রাবি ও মূল কিতাবের নামসহ তৎক্ষণাৎ হাদীস বলতে পারছি। পূর্বেও হাদীস মুখস্থ করতাম, কিন্তু কেউ জিজ্ঞেস করলে বলতে পারতাম না, এই মেহনতের ফলে সে দুর্বলতা কেটে যাচ্ছে”।
- ইসলাম উদ্দীন, ‘শরহে বেকায়া’ পড়েছেন।

প্রস্তাবকের অনুভূতি

শুনেছি, অন্ধদের জন্যও লেখা শেখার বিশেষ পদ্ধতি রয়েছে। তবে বিস্ময় ও প্রেরণার কথা, কথিত আছে, সে পদ্ধতির প্রবক্তা নিজেই নাকি অন্ধ। আসলে অন্ধত্বের যে ব্যথা, সেটা তো অন্ধই অনুভব করতে পারে। হিফজুল হাদীসের কথা যদি বলা হয়, তাহলে আমিও হিফজুল হাদীসে একজন অন্ধ। দুটি হাদীসও ইতমিনানের সাথে সহীহভাবে মুখস্থ বলতে পারি না। লজ্জা লাগে, কষ্ট হয়। তবে এতটুকু ভাবতাম, যদি ছাত্র যামানাতেই এমন কোন পদ্ধতি থাকতো, বিশেষ পরিবেশ থাকতো! যেখানে স্বাভাবিকভাবেই হাদীস মুখস্থের আগ্রহ ধরে রাখা সম্ভব এবং হিম্মত তৈরী হয়! এমন আরো অনেক কিছু!

যাই হোক, বহু চিন্তা-ফিকির, সাধ্য অনুযায়ী মুতালা’আ, নিজে নিজে হাদীস মুখস্থের চেষ্টা-ব্যর্থতা, তালিবে ইলমদেরকে হাদীস মুখস্থ করানোর নিজস্ব কৌশল। বড়দের বিভিন্ন নির্দেশনা, কার্যক্রম ইত্যাদি বিবেচনায় রেখেই চলছিল হিফজুল হাদীস ভাবনা। এক পর্যায়ে সকল ভাবনাকে স্থির করে দিলো একটি নস-
-ينبغي لنا أن نحفظ حديث رسول الله صلىـ كما يُحفظ القرآن. تاريخ دمشق، جـ৮-
এই নস পাওয়ার পর থেকে এলোমেলো ভাবনাগুলো একটি সুনির্দিষ্ট ভাবনায় কেন্দ্রীভ‚ত হতে থাকলো, ‘হিফজুল হাদীসে’র মেহনতটিও পরিকল্পিত একটি রূপরেখা ও কাঠামোতে বিন্যস্ত করার একটি চিন্তা মাথায় আসলো। বিশেষ করে, এ যুগে যেহেতু ‘ব্যক্তিকেন্দ্রীক’ শিক্ষার ধারাটা অপরিচিত, ‘প্রতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা’টাই বেশি গ্রহণীয়, তাই ‘হিফজুল হাদীসে’র ক্ষেত্রেও একটি প্রতিষ্ঠানিক কাঠামো জরুরী ও গুরুত্বপূর্ণ মনে হলো।

এক পর্যায়ে কয়েকজন প্রিয় তালিবে ইলমকে (৩ জন মেশকাত পড়–য়া ও ৩ জন শরহে বেকায়া পড়–য়া মুমতায ও বোর্ড স্ট্যান্ড অর্জনকারি) বিষয়টি খুলে বললাম: তারা ভাবলেন, আগ-পিছ চিন্তা করলেন এবং সম্মত হলেন। অবশেষে কোন প্রচার-প্রসার ছাড়া আল্লাহর উপর পূর্ণ ভরসার সাথেই এক বছর মেয়াদে ‘হিফজুল কুরআনের আলোকে হিফজুল হাদীস’ এর যাত্রা শুরু হলো। আলহামদুলিল্লাহ! পূর্ণ ২৪ ঘন্টা রুটিন অনুযায়ী হিফজুল হাদীসের কার্যক্রম চলমান। খাদেম-তালিবে ইলম সবার মাঝেই এক ধরণের প্রফুল্লতার ছাপ ভেসে উঠছে। আনন্দ-উৎসাহ আর তৃপ্তির সাথেই ‘হিফজুল হাদীসে’র কার্যক্রম চলছে। সব তালিবে ইলমের এক বাক্যে সংক্ষিপ্ত এবং লৌকিকতামুক্ত অভিব্যক্তি হলো, ‘হিফজুল হাদীসের এমন কোন উপকারি পদ্ধতি হতে পারে, কল্পনাও করিনি এবং আমরা সর্ব প্রথম এতে অংশগ্রহণ করে নিজেদেরকে ধন্য মনে করছি। আলহামদুলিল্লাহ!’

তবে তাদের মনে কিছু কষ্টও জমেছে, বিভিন্ন সময় আমাকে জানিয়েছে: “হুজুর! আমাদেরকে কেউ কেউ বিভিন্ন ধরণের মন্তব্য করেন, কিন্তু এর রূপরেখা বুঝতে চাওয়া তো দূরের কথা, শুনতেই চান না। একেক জনের মন্তব্য শুনলে মনে হয়, এ নিয়ে তাঁর কয়েক যুগের গবেষণা রয়েছে। কেউ বলেন: একটা বছরই নষ্ট করে দিলে। কেউ বলেন: হিফজুল হাদীস পড়ে কী লাভ হবে? এখন মুখস্থ করলেও, একসময় তো ভুলেই যাবে। কেউ বলেন: এটা পড়লে কি কোন সার্টিফিকেট দেয়া হবে? চাকুরি পাওয়া যাবে? আকাবির কি এমন কোন পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন? ইত্যাদি। তবে অনেকে আবার উৎসাহ দিয়েছেন। বিস্তারিত শুনে মুগ্ধ হয়েছেন এবং সহমত প্রকাশ করেছেন।” তালিবে ইলমদের কথা শুনে শুধু জিজ্ঞেস করেছি: কারো নেতিবাচক মন্তব্যে কি তোমরা একমত? ঘাবড়ে যাচ্ছো? তাদের একটাই উত্তর; না। আলহামদুলিল্লাহ! এই ৬ তালিবে ইলম এমন, যাদেরকে সাত-পাঁচ বুঝ দিয়ে সান্তনা দেয়া অসম্ভব। তাই নিজের অযোগ্যতাকে ডেকে রাখতে মহামনীষীদের বিভিন্ন বাণী ও কর্মের কথা শুনিয়েই সান্তনা দিচ্ছি। অবশ্য সান্তনা দেয়ার আগেই তাদেরকে শান্ত, নিয়ন্ত্রিত, সন্তুষ্ট এবং আবেগমুক্ত পাচ্ছি। আলহামদুলিল্লাহ!

‘হিফজুল কুরআনের আলোকে হিফজুল হাদীস’ পদ্ধতির মেহনতের ক্ষেত্রে যদি কোন মানুষের শোকরিয়া করতে হয়, তবে সর্বপ্রথম প্রিয় সেই ৬ তালিবে ইলমেরই করতে হয়। যারা গতানুগতিক ধারার বাইরে, অদেখা; সম্পূর্ণ নতুন একটি ইলমী মেহনতে পূর্ণ একটি বছরই ওয়াকফ্ করে দিয়েছেন। ‘হিফজুল হাদীসে’র সাধনায় মগ্ন হয়েছেন। প্রবল আত্মবিশ^াসী ও উদ্যোমী তালিবে ইলমের দ্বারাই সম্ভব একটি বেমেছাল ইলমী মেহনতে শরীক হওয়া। এমনকি একজন সাধারণ অখ্যাত উস্তাদের কথায় তারা যে পরিমাণ আস্থা-বিশ^াস রেখেছেন, সেটাও এ যুগে বেনজীর। তাদেরকে আমি অধমের পক্ষ হতে ক’ফোটা আনন্দাশ্রæ ছাড়া এবং দোয়া ছাড়া কোন কিছুই দেয়ার নেই। আল্লাহ যেন তাদেরকে হাদীসের সুসংবাদে সজিব ও আনন্দিত করেন। . أسعدهم الله في الدارين.। আমীন।
 
আসলে কথা যাই হোক, ‘হিফজুল কুরআনের আলোকে হিফজুল হাদীস’ এর ফলাফল কী? সেটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। হাতের পুস্তিকাটিতে সে সম্পর্কে বিভিন্নভাবে বলার চেষ্টা করা হয়েছে। তারপরেও ক্ষ‚‚দ্র অভিজ্ঞতা থেকে যতটুকু বলা যায়, হুফফাজে কুরআনের দিকে তাকালে যেমনটা অনুধাবন করি, হিফজুল হাদীসের ক্ষেত্রে অনেকটা তেমনই। আসলে সকল শাস্ত্র-জ্ঞানের ক্ষেত্রেই তো এ কথা প্রযোজ্য, মুখস্থ করাটাই শেষ কথা নয়, এটা ধরে রাখার জন্য যথাযথভাবে চর্চা থাকতে হবে। ১০ টি হাদীস মুখস্থ করলে অন্তত ৩ টি হাদীস তো মনে থাকবে। ১০০ জন তালিবে ইলমের মাঝে ১০ জন তো পাওয়া যাবে, যারা হাদীসগুলো মনে রাখতে পারবে। অন্তত এতটুকু আশা তো অবাস্তব ও অসম্ভব নয়, পরবর্তীতে কয়েকবার নজর বুলালেই প্রয়োজনের মুহুর্তে নির্ধারিত বিষয়ের হাদীসটি আবার মুখস্থ হয়ে যাবে। হিফজুল কুরআনে তো আমাদের অভিজ্ঞতা এমনই। যদি এক বছরের সামাআ’তে হাদীস ও শরাহে সৌভাগ্যবান মনে হয়, তাহলে এক বছরের হিফজুল হাদীস কি কম সৌভাগ্যের?

‘হিফজুল কুরআনের আলোকে হিফজুল হাদীস’ এর মেহনত শুরু করতে গিয়ে, কাছ-দূরের বহু জনের, বহু মন্তব্য হজম করতে হয়েছে, হচ্ছে এবং হয়ত আরো করতে হবে। সকলের প্রতি শুভকামনা ও শোকরিয়া জানিয়েই শুধু এতটুকু নিবেদন- অন্তত তাঁদের মাকবুল দোয়ায় যেন ‘হিফুজল হাদীসে’র উপকারিতার দোয়া থাকে এবং অধমের জন্য হেদায়াতের দোয়া থাকে। যেখানে হিফজুল হাদীসের পুরোধা ‘আবু হুরায়রা রা. কে শুধু হিফজুল হাদীসের আধিক্যের কারণে বিভিন্ন কথা শুনতে হয়েছে এবং তাতে তিনি কষ্টও পেয়েছেন’, সেখানে নগন্য কোন ব্যক্তির নিরুৎসাহিত হওয়ার কী আছে? তাবলীগী জামাতের প্রস্তাবক ইলিয়াস রহ. এর একটি বিষয় বড় প্রেরণার- তিনি সম্ভবত এমন বলেছিলেন ‘আমার এই কাজ যদি কুরআন-হাদীস অনুযায়ী হয়, তবে তা রক্ষার দায়িত্ব আল্লাহরই। আর যদি কুরআন হাদীসের খেলাফ হয়, তবে তা বন্ধ হয়ে যাক’। সুতরাং যে পদ্ধতি এ নালায়েকের মতো কোন অযোগ্য-অধমের আবেগ, ধারণা বা মস্তিষ্কপ্রসূত নয়, বরং আসলাফ ও হুফফাজে হাদীসের জীবনী নির্ভর, তাঁদের কর্ম-চেতনা ও নির্দেশনার আলোকেই সাজানো এবং বিন্যস্ত, সে পদ্ধতি গ্রহণের মাঝে পরবর্তীদের কামিয়াবীরই আশা করা যায়। আল্লাহ যেন সবাইকেই কবুল করেন। আমীন।

-প্রস্তাবক, আসাদুল্লাহ সুলতান